ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন

৯ মেয়রপ্রার্থী মাঠে তৎপর

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায় ও মীর গোলাম মোস্তফা

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দিতে চায় আওয়ামী লীগ। গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে, এমন যোগ্য মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের প্রার্থী যাচাই-বাছাই কাজ শুরু করেছে দলটি। আগামী ৫ মে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নতুন এ সিটি করপোরেশনে প্রথম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর মেয়র পদে এ পর্যন্ত নয়জন প্রার্থী প্রচারকাজ শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এ ছাড়াও মেয়র পদে নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন স্বতন্ত্রসহ মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোট শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) তিন প্রার্থী।

সম্ভাব্য প্রায় সব প্রার্থীই নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার সাঁটিয়ে প্রার্থিতার কথা জানাচ্ছেন। কেউ কেউ সংবাদ সম্মেলন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা তুলে ধরছেন। সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরাও দলীয় মনোনয়ন পেতে তদবির-লবিং শুরু করেছেন। গত সোমবার থেকে ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা দেওয়ার কাজ শেষ  করেছে আওয়ামী লীগ। আগ্রহীরা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় মেয়র পদে প্রার্থিতা নিয়ে একমত হতে না পারায় ছয়জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর নামই প্রস্তাব করে চূড়ান্ত মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

৯১ দশমিক ৩১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখের বেশি। বিভাগ হওয়ার পর ময়মনসিংহকে দ্বাদশ সিটি করপোরেশন ঘোষণা করে গত বছরের ১৫ অক্টোবর গেজেট প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে এখানে সরকার মনোনীত প্রশাসক করপোরেশনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা বলছেন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বাত্মক জয় নিশ্চিত করতে বিতর্কের ঊর্ধ্বে আছেন এমন প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন বিতর্কমুক্ত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের প্রত্যাশাও করছেন তারা। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠায় তারা চাইছেন, এ নির্বাচন বিতর্কমুক্ত হোক। সন্তোষজনক ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে উপযুক্ত প্রার্থী মনোনয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

এদিকে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো উপজেলা নির্বাচনের মতো এ সিটি নির্বাচনেও আসছে না- এটি নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তা রয়েছে ক্ষমতাসীন দলে। কেননা, নির্বাচন ও রাজনীতির মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি না থাকায় চলমান উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি খুবই কমে এসেছে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চার ধাপের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অনুপস্থিতির সুবাদে ভোটকেন্দ্রে নগণ্যসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলে। ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে সরকারের ইমেজ বাড়াতে আরও কী কী করা যায়, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে সরকারি দলে।

এ লক্ষ্যে মেয়র এবং ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ১১টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্যানেল সুপারিশের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রার্থীদের যোগ্যতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমাদান কার্যক্রম শেষে দু'একদিনের মধ্যে দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক ডাকা হতে পারে। সেখানেই ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। আগামীকাল শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

মেয়র ও কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও বিএনপির বর্জনের মুখে নির্বাচনকে জমজমাট করতে কাউন্সিলর পদের প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন ৩৬টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ১২টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের নির্বাচনেও এ রকম করা হয়েছিল। একই কৌশল নেওয়া হয়েছে চলমান পাঁচ ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে।

আওয়ামী লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছয়জন :আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইকরামুল হক টিটু। স্থানীয় পৌরসভায় প্রায় ১০ বছর ধরে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী টিটু সমকালকে বলেন, নবগঠিত সিটির প্রথম প্রশাসক হিসেবে তিনি এই মহানগরীকে ডিজিটালাইজড সিটি করার পরিকল্পনা করছেন। এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছেন। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জয়ী হলে সাবেক পৌর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক, নান্দনিক ও নাগরিকদের উন্নত জীবনযাপনের উপযোগী সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে চান তিনি।

মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এহতেশামুল আলম গত শুক্রবার ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি সিটি করপোরেশনে আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতির বাস্তবায়ন ঘটাবেন। যানজট দূর করে সিটিঅ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা ও নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করবেন তিনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেয়র পদে যাকে মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষেই তিনি মাঠে কাজ করবেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহিত উর রহমান শান্তও মেয়র প্রার্থী হিসেবে জোরালো আলোচনায় রয়েছেন। বিভিন্ন উৎসব-আয়োজন, বিলবোর্ড ও পোস্টারের মধ্য দিয়ে প্রচারের প্রাথমিক কাজও শুরু করেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে শান্ত সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তাদের অভিভাবক। তিনি ভালো করেই জানেন, প্রার্থী হতে কে কে আগ্রহী; দলে তাদের কে কতটুকু অবদান রেখেছেন বা রাখছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাই তার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন।

এ ছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাদেক খান মিল্ক্কী টজু এবং সদস্য একেএম সাজ্জাদ হোসেন শাহীন ও ফারামার্জ আল নুর রাজীবও মেয়র পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন।

এদিকে, ময়মনসিংহ সিটির মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সোমবার একটি হোটেলে বর্ধিত সভা আহ্বান করে। ওইদিন রাত ১০টা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সভা মুলতবি করা হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলমের সভাপতিত্বে মুলতবি বর্ধিত সভায় কোনো একক প্রার্থীর পক্ষে নেতারা একমত না হওয়ায় মনোনয়নপ্রত্যাশী উপরোল্লিখিত ছয় প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গতকালই ছয়জনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বর্ধিত সভায় মহানগর কমিটির সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সমকালকে বলেন, তৃণমূল থেকে আসা সুপারিশ ও দলীয় জরিপের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে উপযুক্ত, যোগ্য ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এবং সৎ প্রার্থীই দেওয়া হবে। জাতীয় নির্বাচন ও চলমান উপজেলা নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনেও জনগণের বিপুল সমর্থন ও ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই বিজয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী যারা :এদিকে জাতীয় পার্টি থেকে দলটির ময়মনসিংহ জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা সরকার মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচারে নেমেছেন। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত সাবেক আকুয়া ইউনিয়ন পরিষদে দুই মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সমকালকে তিনি বলেন, তার নেত্রী সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের প্রচেষ্টায় ময়মনসিংহ বিভাগ ও সিটি করপোরেশন হয়েছে। আরও বড় পরিসরে দায়িত্ব পালন করার প্রত্যাশায় তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন।

সিপিবির ময়মনসিংহ জেলা সদস্য ও মহিলা পরিষদের জেলা সভাপতি মনিরা বেগম অনু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে মেয়র পদে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে প্রচারকাজ শুরু করেছেন। তিনি জানান, সিপিবি জেলা কমিটি সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এরই মধ্যে তাকে (অনু) মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বলেছে। সে অনুযায়ী তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. বিশ্বজিৎ ভাদুড়ী মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারকাজ শুরু করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে একটি সুন্দর সিটি গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানান তিনি।

বিষয় : ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন