রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে গত ছয় বছর ধরছে চলছে নানা জল্পনাকল্পনা। সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুতে নতুন মাত্রা যুক্ত করলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট। ১৬ আগস্ট উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন তিনি। রোহিঙ্গারা তাঁর কাছে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেল, তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য এখনও অনুকূলে নয় এবং পরামর্শ দিয়েছেন অপেক্ষা ও ধৈর্য ধারণের। 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালায়। বাংলাদেশ সরকার তখন মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। এরই মধ্যে ছয় বছর অতিবাহিত হয়েছে, নানা নাটকীয়তার চাদরে মিয়ানমার ঢেকে দিচ্ছে বা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ইস্যুকে। মিয়ানমার সব সময় আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আন্তরিক, কিন্তু তাদের বাস্তবিক পদক্ষেপ নানা নাটকীয়তায় ভরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফা-সংবলিত একটা সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হলেও তার বাস্তব প্রতিফলন আজও দৃশ্যমান নয়। সাত ভাগে বিভক্ত করে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার নিজেদের দেশে ফেরত নেওয়ার কথা ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট প্রকাশ করে। তবে সেটা রয়ে যায় আঁধারে। ২০১৯ সালে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আরোপিত মামলার শুনানি শেষে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি মামলার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশনা আসেনি। 

এরপর করোনা ও মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের কারণে আটকে পড়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাই। এই রাজনৈতিক পট নতুনভাবে ভাবাতে শুরু করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনাকে। ২০২১ সালের ১৮ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারবিষয়ক গৃহীত রেজুলেশনে দেশটির গণতান্ত্রিক সমস্যাসহ অনেক বিষয়ের উল্লেখ থাকলেও ছিল না রোহিঙ্গা সংকট সমাধান সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা। ২০২১ সালের ১২ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৪৭তম অধিবেশনে রোহিঙ্গাবিষয়ক গৃহীত রেজ্যুলেশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়।

এরই মধ্যে নতুন নাটকীয়তা জন্ম দেয় ২০২২ সালে বাংলাদেশের কাছে মিয়ানমারের পাঠানো রোহিঙ্গাদের একটা তালিকা। ১১ হাজার জনের তালিকা পাঠানোর কথা থাকলেও সেই তালিকায় স্থান পায় মাত্র ৭০০ জন। সেই তালিকায় এক পরিবার থেকে বাবা থাকলেও তালিকায় স্থান মেলেনি পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম। এটাও মিয়ানমারের একটা নতুন কৌশল। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সদস্যদের বাদ দিয়ে কেউ যেতে চাইবেন না। ঘটলও তা-ই। এই তালিকায় স্থান পাওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানান। 

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মহলের নির্লিপ্ততা, জাতিসংঘের নীরবতা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়সহ নানা দিক রয়েছে। এখানে একটি বিষয় অবলোকন করা দরকার, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর মাঝ থেকে সরব কণ্ঠস্বরকে বিলীন করা। 'মুহিবুল্লাহ', রোহিঙ্গারা যাকে 'মাস্টার মুহিবুল্লাহ' নামেও ডাকতেন, তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সরব ভূমিকায় ছিলেন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে একাধিকবার সফর, ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা আগমনের বর্ষপূর্তিতে তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে মহাসমাবেশ আয়োজনের মতো পদক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২১ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে বন্দুকধারীরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। তবে কেন এই হত্যাকাণ্ড তার বিস্তারিত জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এই হত্যার পেছনে ছিল মিয়ানমারের হাত। এটা স্পষ্টত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সরব কণ্ঠস্বরকে চিরতরে বিলীন করা। 

এখন ফেরা যাক মিশেল ব্যাশেলেটের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের ঘটনার পরে ইতোমধ্যে ছয় বছর অতিবাহিত হয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রাখাইন রাজ্যের বিষয়ে সঠিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রকাশ করা হচ্ছে না। মাঝে মাঝে আরসা বা আরাকান আর্মিদের মতো কিছু সংগঠনের দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফেরত নেওয়ার দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই রাখাইন রাজ্যকে ঘিরে চীন, ভারত, রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রের হাতে নেওয়া নানা অর্থনৈতিক প্রকল্প। এর মধ্যে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' প্রকল্প, থেলং মিয়ানমার-চীন তেল, গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ, ভারত কালাদান বহুমুখী প্রকল্প, দুটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প, মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী চার লেন মহাসড়ক স্থাপন প্রকল্প, রাশিয়ার তেল কোম্পানি বাশনেফটের বিনিয়োগ, জাপান সরকারের রাখাইনের মংডুর কাছাকাছি পরিকল্পিত ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার মতো প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকার সুকৌশলে কাজ করে চলেছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করলে ভেস্তে যেতে পারে এই ধরনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। এটা বোঝার বাকি থাকার কথা নয়, মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনীতি করে চলেছে। সেই সূত্রে মিশেল ব্যাশেলেটের এই অপেক্ষার বাণী নতুন করে ভাবাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সমাধানের পথকে। এখন দেখা যাক, এই অপেক্ষার কখন পরিসমাপ্তি হয়!