বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া ভাষণে, বক্তব্যে- জনস্বার্থে, জনগণের জন্য, জনগণের মঙ্গলের জন্য, জনবান্ধব- এমন শব্দগুলো অহরহ শোনা যায়। কার্যত এই শব্দগুলোর বাস্তবিক চর্চা এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কতটা প্রতিফলিত হয় তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এর অনেক ক্ষেত্রেই যে জনদুর্ভোগের নজির সৃষ্টি হয় তা বর্ণনাতীত। বিশেষ করে রাজপথে যে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো পালিত হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে জনস্বার্থের কথা যে বিবেচনায় রাখা হয় না তা বেশ জোর দিয়েই দাবি করা যায়।

রাজধানীর মানুষ তাঁদের প্রতিদিনের জীবনে সবচেয়ে কঠিন দুর্ভোগ সহ্য করেন যানজটে। ছুটির দিন ছাড়া অন্য দিনগুলোতে এই ভোগান্তির কারণে বেশ বেগ পেতে হয় রাজধানীবাসীকে। হালে নানা কারণে এই সমস্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথের কর্মসূচিতে এই ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। এতে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় মেতেছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু দল মুখে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বললেও দলকে চাঙ্গা রাখতে প্রায়ই রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছে। জনস্বার্থবিষয়ক নানা ইস্যুতে এসব কর্মসূচি ঘোষিত হলেও মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানানোই যে মূল উদ্দেশ্য, তা বলাই যায়।

পক্ষান্তরে বিরোধী দলের কর্মসূচির জবাবে এবং বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত দল ও তাঁর অঙ্গসংগঠনগুলোর সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলও। রাজনীতির এই মাঠ গরমের খেলায় নাকাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো আরেকটু সচেতনভাবে এবং সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে ছুটির দিনগুলোতে এবং নির্দিষ্ট কোথাও আয়োজনের পরিকল্পনা করা যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজধানীবাসী। একই সঙ্গে তাঁরা দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁরা যেন এই ভোগান্তি থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার একটা পথ বের করেন।

গত বুধবার ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার স্মরণে সমাবেশ আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। তবে প্রতি বছরের কর্মসূচির সঙ্গে এবারের কর্মসূচির পার্থক্য ছিল। এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় ক্ষমতাসীন দল নেতাকর্মীদের নিয়ে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে। এই লক্ষ্যে শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও নেতাকর্মীদের জমায়েতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জমায়েত হন রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে। বিকেল ৪টায় জমায়েত হওয়ার কথা থাকলেও আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। ফলে কার্যত দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন সড়ক অচল হয়ে যায় মিছিলে মিছিলে। সৃষ্টি হয় দুঃসহ যানজট। আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচিতে নগরীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মিছিলের কারণে এক পর্যায়ে শাহবাগ থেকে গুলিস্তানের দিকে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, এবারের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল চলতি মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথ সরব রাখার জবাব।

চলতি মাসে বেশ কয়েক দিন নয়াপল্টনের সড়ক বন্ধ রেখে জমায়েত করে বিএনপি। প্রায় প্রতিদিনই সড়কে দেখা গেছে তীব্র যানজট। ৪ আগস্ট নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে ভোলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ছাত্রদল নেতা নুরে আলমের জানাজা পড়ে বিএনপি। পরে সেখানে হয় সমাবেশ। এর দুই দিন পর একই সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। ভোলার সেই ঘটনায় ৮ আগস্ট একই সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল।

তিন দিন পর ১১ আগস্ট সেই সড়কে দুপুরের পর থেকে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সমাবেশ করে বিএনপি। একই দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে নতুন রাজনৈতিক জোট গণতান্ত্রিক মঞ্চ। এর পরদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপিপন্থি পেশাজীবী সংগঠনের সমাবেশ হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। সেদিনও যান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে কয়েক ঘণ্টা।

১৬ আগস্ট জ্বালানি তেল ও ইউরিয়া সারের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিমুখে মিছিল করে গণতান্ত্রিক বাম জোট। সেটি শাহবাগে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এই কর্মসূচি ঘিরেও কয়েক ঘণ্টা ব্যস্ত এ সড়ক স্থবির হয়ে থাকে। 

অনেকেই মনে করছেন রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার যথেষ্ট অভাব আছে বলেই তাঁরা মানুষের সমস্যার কথা চিন্তা না করে শুধু নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য এসব করছে। রাজনৈতিক মতভেদ যতই থাক, এই বিষয়গুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ভাবতে হবে দলগুলোকে। সময়ের সঙ্গে রাজপথে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা যে ক্রমে বাড়বে তা চলমান পরিস্থিতি দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই রাজপথে বাড়বে দলগুলোর শোডাউন, কর্মসূচি। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষকে যদি এভাবে ভুগতে হয় তাহলে এই রাজনীতি কাদের জন্য? পরিস্থিতি বিবেচনায়, সময় থাকতে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতার স্থান থেকে তাদের ভোগান্তি সৃষ্টি না করে কীভাবে এসব কার্যক্রম চালানো যায় তার একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত পন্থা নির্ধারণের মাধ্যমে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। অন্তত এতটুকু সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তো মানুষ আশা করতেই পারে।