ডোপেলগ্যাংগার বা দ্বৈতসত্তা জার্মান ফিকশন ও মিথোলজি সংশ্নিষ্ট একটি লিটারেরি টার্ম। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেনসেশন সাকিব তাঁর ক্রিকেটিং রেকর্ড আর বাইরের যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে সত্যিকারের এক মিথোলজিক্যাল চরিত্র বেশ আগে থেকেই। বেটউইনার নামে বিতর্কিত সাইটের প্রচারণা দূত হতে চেয়ে সু-সাকিবের বিপরীত সত্তাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ভালো আর খারাপের চিরন্তন দ্বন্দ্বের ফলিত প্রকাশ প্রায়ই দেখতে পাই সাকিব আল হাসানের কাছ থেকে।

পুরো বিশ্বে ক্রীড়াবিষয়ক অবৈধ জুয়ার বাজার অবিশ্বাস্য পরিমাণের, ডলারের হিসাবে ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই হিসাবটি জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ-সংক্রান্ত জরিপ থেকে পাওয়া। দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার গত বছরের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে জুয়ার বাজার ৬ হাজার কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার। এই অর্থ বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের প্রায় সমান। এই জুয়ার ৮০ শতাংশ চলে ক্রিকেট ঘিরে। আর এর বড় একটা লেনদেন হয় আইপিএল মৌসুমে। বিপিএল তত বড় না, কিন্তু জুয়াড়িরা সেটা কেন্দ্র করেও ব্যাবসা করেন।

বেটিং কিছু দেশে আইনসিদ্ধ। তবে আমাদের দেশে আইনবিরুদ্ধ ও একই সঙ্গে এ ধরনের সংশ্নিষ্টতা নীতিবিরুদ্ধ বলে বিবেচিত। আইসিসি যেটি ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সেটিও এ বিষয়ে কঠোর। এর ধারা মেনে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডও বেশ কঠোর। বেটিংয়ের ব্যাপারে বিসিবি 'শূন্য সহিষুষ্ণতা' নীতি মানলেই এটি যথাযথভাবে কার্যকর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি সর্বাত্মক পরিকল্পনা। প্রয়োজন কমিটমেন্ট আর সার্বত্রিক নীতি অবিচলতা।

সাকিবের চুক্তির বিষয়টির আলোচনা তীব্রতা পেলে তিনি নসিহত করার চেষ্টা করেছেন, বেটউইনারের সঙ্গে চুক্তিটি নাকি আইনগতভাবে কোনো সমস্যার না। সাকিব যুক্তি দিয়েছেন বেটউইনার একটি সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট। এর সঙ্গে বেটিং বা জুয়ার সম্পর্ক নেই। বেটউইনারের সঙ্গে চুক্তি করে দেশের আইন তিনি ভঙ্গ করেননি।

তিন ফরম্যাটেই এত বেশি খেলা ফিজিক্যাল ইনজুরি এই সময়ে খুব নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেটাররা যখন খেলেন, জীবনের সবটা দিয়ে দেশ ও দলের জন্য খেলেন, তখন শরীরী অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে নিংড়ে দেন নিজের সামর্থ্যের সব। তামিম থেঁতলে যাওয়া আঙুল নিয়ে এক হাতে ব্যাট করতে নেমে মনে করিয়ে দেন রক্তাক্ত সৈনিকের বুক আগলে দল ও সাথীদের রক্ষা করার বীরোত্তম সাহসিকতা। দলের জন্য খেলতে সবার যতবার না শল্য চিকিৎসা নিতে হয়েছে, মাশরাফির একারই হয়তো তার চেয়ে বেশিবার পায়ের কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে। শারীরিক এসব ইনজুরি খেলার নিত্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সাকিব আল হাসান এর আগে বুকির কল পেয়েও তা যথাযথভাবে না জানানোয় ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ভয়ংকরভাবে খেসারত দিতে হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। আর এবার জুয়া-সংশ্নিষ্ট সাইটের প্রচার দূত হয়ে নতুন আঘাত দিয়েছেন। এ ঘটনাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য মোরাল ইনজুরি বলা যেতে পারে। আসলে ক্রিকেটাররা কেউ তো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নন। কারণ রাষ্ট্র, সমাজও এমন নানা ক্ষত নিয়ে আঘাত-জর্জর।

স্পোর্টস বেটিং জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি অন্ধকার বাণিজ্যিক দিক। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ের ভারতীয় জুয়াড়িদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে ম্যাচ গড়াপেটায় ক্রিকেট ভিলেন হয়ে আছেন। হ্যান্সি ক্রনিয়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্রিকেটে আইসিসি দুর্নীতিবিরোধী কমিটি বা আকসু গঠন করে। এরপর থেকে আকসু এমন বেশ কিছু ঘটনা জনসমক্ষে নিয়ে আসে। ফুটবলে বলবর্ধক নিষিদ্ধ ড্রাগ, অ্যাথলেটিকসে স্টেরয়েড গ্রহণ বিষয়ে এসব খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যেমন বেশ তৎপর। তেমন বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ক্রিকেটারদের মাদকদ্রব্য সেবন, বেটিং ইত্যাদিতে জড়িত অপরাধ রোধে আইসিসি কাজ করছে বেশ কিছুদিন ধরে।

বেটিং ঠেকাতে আইসিসি দুর্নীতিবিরোধী ও নিরাপত্তা কমিটি বা আকসু গঠন করে। ২০০০ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে কমিটির কিছু পদক্ষেপ ক্রিকেটের দুর্নীতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ভারতের মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন এবং অজয় জাদেজার পর ২০১০ সালে মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ ও সালমান বাট- এই তিন পাকিস্তানি খেলোয়াড়কে ম্যাচ ফিপিংয়ের জন্য যথাক্রমে ৫, ৭ ও ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেয় আইসিসি। বিপিএলে ম্যাচ পাতিয়ে আরেক বাংলাদেশি মোহাম্মদ আশরাফুলের পর সাকিব আইসিসির নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন।

ক্রিকেটে দুর্নীতি ও ফিপিং প্রতিরোধে আইসিসির সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলোতে সাকিব বরাবরই ক্রিয়াশীল ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে চালু হওয়া 'আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস বেশ ভালোই জানা বাংলাদেশের অন্য যে কোনো ক্রিকেটারের চেয়ে। অথচ তিনিই দেশের আইনবিরোধী তো বটেই, সংবিধানের এর স্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও বেটিং-সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দূত হলেন? সাকিব নিজে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার মানসে ক্রিকেটকে ইনজুরড করলেন। 

বাংলাদেশে জুয়াবিষয়ক আইনটি ১৫০ বছরের বেশি পুরোনো আইন 'প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৮৬৭'। প্রকাশ্য জুয়া খেলা নিষিদ্ধ এ আইনে যা মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে প্রযোজ্য হয়। কারণ মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী জুয়াবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এ ছাড়া দেশের সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের ২ বলেছে, 'গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।'

১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের (কন্ট্রাক্ট ল') ৩০ ধারার আওতায় জুয়া-সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বাতিল বলে গণ্য। কেইস ল উল্লেখ করলে বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের জুয়াবিরোধী একটি রায় প্রাসঙ্গিক। এতে বলা হয়, অর্থ দিয়ে সব খেলাই অবৈধ। সেই বিবেচনায় জুয়া ও গেমস সমার্থক। আর সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্টের এই নির্দেশনা আইনের মান্যতা দাবি করে।

মানুষের শুদ্ধ আবেগ কাজ করে যে কোনো খেলা ঘিরে। নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দেশটির এই খেলাটিই যা আন্তর্জাতিক মানের। সেটিও যখন স্খলনের শিকার, তখন আশাহত হতে হয়। এ ঘটনা হোক স্খলনের শেষ নজির। খেলা খেলোয়াড়দের হাতেই থাকুক। খেলা ঘিরে সব আনাচার থাকুক সীমানার বাইরে।