সেই যে কবে পৃথিবী সৃষ্টির পর মানব জাতির সৃষ্টি হলো তার সঠিক দিনকাল আমরা জানতে পারিনি। জানার দরকার আছে কি? জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (দূরের জিনিসের ছবি তোলার যন্ত্র) গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর মহাকাশে পাঠানো হয়। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরত্বে এই টেলিস্কোপটি অবস্থান নেয়। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা মিলে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এটি নির্মাণ করেছে। আগামীতে এই টেলিস্কোপ আমাদের জন্য খুঁজে আনবে অজানা ইতিহাস। এই টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র আকাশে অনেক কিছুই পর্যবেক্ষণ করবে। তবে এর প্রধান দুটি লক্ষ্য রয়েছে। একটি হলো, মহাকাশে ১৩৫০ কোটি বছর আগে একেবারে প্রথম জন্ম নেওয়া তারাগুলোর আলোর বিচ্ছুরণ কীভাবে ঘটেছিল তার ছবি নেওয়া এবং দ্বিতীয়টি হলো, দূরের গ্রহগুলো মানুষের বাসযোগ্য কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা। এখন এর চেয়েও বড় সুখবর হলো, বিজ্ঞানীরা ওয়েব টেলিস্কোপের তথ্যের গুণগত মান বিশ্নেষণ করে বুঝতে পারছেন, এই ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে, এই টেলিস্কোপ তার চেয়েও অনেক গভীরে গিয়ে মহাজগতের চিত্র তুলে আনতে সক্ষম হবে। এর ফলে, অতি শক্তিশালী এই দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মহাশূন্যের অনেক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

'আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল। আর এই ছবিতে আপনি ছোট ছোট যে আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলো ভ্রমণ করেছে ১৩০০ কোটি বছর'- বলছেন নাসার গবেষক। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মাত্র সাড়ে ১২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে মহাবিশ্বের গভীর থেকে এই ছবি তুলে এনেছে।

জেমস টেলিস্কোপের ছবি থেকে আমরা যে জ্ঞান পেলাম, সেখান থেকে আমাদের কি শিক্ষা নেওয়ার মতো কিছু অবশ্যই আছে!

মহাবিশ্বের বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালাপির মধ্যে একটি গ্যালাপি হচ্ছে আমাদের মিল্ক্কিওয়ে গ্যালাপি। আমাদের গ্যালাপির বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে একটি হচ্ছে সূর্য। সূর্যের আটটি গ্রহের মধ্যে একটি হচ্ছে পৃথিবী। পৃথিবীর প্রায় ৮৭ লাখ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে একটি হচ্ছে মানুষ! পৃথিবীতে আমরা মানুষ জাতি সেরা জীব বলে দাবি করলেও, গোটা মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা অতি ক্ষুদ্র!

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণা করে আমরা মহাকাশের হাজারো অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতে পারব, সভ্যতার অগ্রগতিতে যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে।

যাই হোক আমাদের এখন নিজ নিজ জ্ঞানে সামনের দিকে এগোতে হবে এবং তার জন্য দরকার দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো। পরবর্তী প্রজন্মকে আমার কাছে একটু বিজ্ঞানবিমুখ বলে মনে হয়। আরও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেখানে পুরো বিশ্ব সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা পরিকল্পিতভাবে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষককে হেনস্তা করছি! এসব আমাদের জন্য একদমই ভালো ফল বয়ে আনবে না। এখনই সময় সচেতন হওয়ার। নইলে দুনিয়ার সব শিক্ষিত সচেতন মানুষরা সামনে এগিয়ে যাবে, আর আমরা পড়ে থাকব শত শত বছর পেছনে।

দেশে বিজ্ঞান গবেষণা বিষয়ে নতুন নতুন ইনস্টিটিউট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। বিদ্যমান বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্যাসিলিটি বাড়ানো দরকার, সেই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতেও উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের স্টুডেন্টরা যখন নাসাসহ বিভিন্ন বড় মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রজেক্টে জড়িত থাকবে, তখন আমরাও গর্ব করে বলতে পারব, মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদেরও অবদান আছে। সাতসকালে এমন করে ভাবছি কারণ সুইডেনে অনেকেই এমন করে শুধু ভাবছে না, রীতিমতো কাজ করে চলছে এবং কৃতিত্বের সঙ্গে পৃথিবীতে তাদের অবদান জন্মে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রেখে তো যাচ্ছেই সঙ্গে আজীবন যাতে সেটা চলমান থাকে তার সুব্যবস্থাও করে গেছে, করে যাচ্ছে। আমি যে দু'জন মহামানবের কথা ভাবছি তাঁরা হলেন আলফ্রেড নোবেল এবং ইঙ্গভার কামপ্রাদ। একজন ছিলেন বিজ্ঞানমুখী, অন্যজন ছিলেন একজন বুদ্ধিমান উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, বিশাল ফার্নিচার সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং ধনীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কার্মুডজিয়ন।

অন্যদিকে, আলফ্রেড নোবেল সেই ডিনামাইট আবিস্কার করে বিশ্বের মানুষকে নানাভাবে উন্নতির শীর্ষে উপনীত করতে সাহায্য করেন। তিনি তাঁর সম্পদের বড় একটি অর্থ ডোনেট করেছিলন এবং তা ছিল ৩৩ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। সেই শত বছর আগে বিশ্ব উন্নয়নে এবং মানবকল্যাণে যা ছিল তখনকার সময়ের মোটা অঙ্কের অর্থ। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ছিল ১৫০৮০০ সুইডিশ ক্রোনার। বর্তমান পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। ইঙ্গভারও ডোনেট করেছেন তাঁর সঞ্চিত অর্থের অর্ধেক, যার মূল্য এ সময়ে ৬৭০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। পার্থক্য শুধু আলফ্রেড গোটা বিশ্বের মানুষকে সুযোগ করে দিয়েছেন তাঁর অর্থ পেতে, অন্যদিকে ইঙ্গভার শুধু সুইডেনের নর্থে যাঁরা বসবাস করছেন এবং যাঁরা শিল্পকারখানার উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবক, শুধু তাঁদের জন্যে তাঁর এই বিশাল সম্পদ দিয়ে গেছেন। তবে ইতোমধ্যে সুইডেনের নর্থে যে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেখানে শিল্পকারখানার গবেষণা প্রকল্পে ১০০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার দেওয়া হয়েছে। 

পৃথিবী যতদিন থাকবে, আলফ্রেড এবং ইঙ্গভার মানবের মাঝে বেছে থাকবেন তাঁদের কৃতিত্বের অবদানের কারণে। এভাবেই শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো আজীবন মানুষের মাঝে অমর হয়ে বেঁচে থাকবেন।

আমার ভাবনায় ঢুকেছে আমরা কীভাবে আজীবন স্মরণীয় হয়ে বেঁচে থাকব? কী থাকবে আমাদের অবদান? বড় কিছু না হোক বা বড় কিছু না করতে পারি, সীমিত কিছু ভালো কাজ অগত্যা করে যেতে চাই এমন মানসিকতা যেন তৈরি হয় আমাদের মাঝে।