গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় জনস্বার্থে আইনের যথাযথ অনুসরণই প্রত্যাশিত। এর ব্যতিক্রম হলে জনআকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হয় এবং তা সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন জনতারই বিজয় হয়। সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু মানুষ যেন সচেতনভাবেই আজকাল জনতাকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে! কিছুদিন আগে একটি খেলার মাঠকে পুলিশের থানা বানাতে গিয়ে কি কাণ্ডটাই না ঘটে গেল। শিশু সন্তান আর তার মাকে শেকলে আটকে দিল পুলিশ। মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। একদিকে ইনিয়ে-বিনিয়ে থানা ভবন নির্মাণের যৌক্তিকতা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, আর অন্যদিকে জোরেশোরে নির্মাণ কাজ চালালেন। হাজার হাজার বহুতল ভবনের লাখো মানুষের জন্য একমাত্র উন্মুক্ত স্থানটি জনস্বাস্থ্য আর পরিবেশের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা তা আমলেই নিলেন না। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে তারা সরে আসে। তেঁতুলতলা মাঠে থানা নয়, খেলার মাঠই থাকছে। 

সব দেশেই প্রতিটি সরকারের সময়েই কিছু বরেণ্য মানুষ থাকেন, যাদের দল বা সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার কোনো কারণে জনস্বার্থ পরিপন্থি কোনো পদক্ষেপ নিলে তারা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন, সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ড. আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক জাফর ইকবালের মতো মানুষদের জনগণ সরকারের এমন শুভাকাঙ্ক্ষী বা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হিসেবেই ভেবে থাকেন। এসব বরেণ্য গুণীজনের আকুতিকেও মহাক্ষমতাধর কিছু মানুষ পাত্তা দিলেন না। যা হওয়ার তাই হলো, জনতা দাঁড়িয়ে গেল। পরিশেষে অতি ছোট একটি কাজ তার জন্যও বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে এসে পরিস্থিতির সামাল দিতে হলো।

অতীতে দেখেছি, রেলস্টেশন ও রেল গাড়ির বগিতে লেখা থাকে 'বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ আইনত দণ্ডনীয়। অমান্যকারীর জেল-জরিমানা দুটোই হতে পারে'। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকি, দেশে গেলেও রেল ভ্রমণের সুযোগ হয় না। তাই এই আইন বা বিধি-বিধানের কোনো কার্যকারিতা আছে কিনা জানা নেই। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত একটি সংবাদে বুঝতে পারি, বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ এখন কিছু কিছু মানুষের জন্য দণ্ডনীয় নয়। আর এসব মানুষকে চিনতে না পারলে দণ্ডটি উল্টো দণ্ডদাতার কাঁধেই নিপতিত হয়। তাই উত্তরবঙ্গের এক ট্রেনের টিটিইকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে।

টিটিই সাহেবের অপরাধ তিনি বিনা টিকিটের যাত্রীদের টিকিট করতে বাধ্য করেছিলেন। আর তার চেয়ে বড় অপরাধ, তিনি অসীম ক্ষমতাধর রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয়দের চিনতে পারেননি। যার ফলে কোনো প্রকার তদন্ত ব্যতিরেকেই টিটিই সাহেবকে সাময়িক বরখাস্ত হতে হয়েছে। সেখানে ব্যাপক সমালোচনার মুখেই বলা যায় দ্রুতই শুভবুদ্ধির উদয় হলো, রেলমন্ত্রী মুখ খুললেন, টিটিই সাহেবের চাকরি রক্ষা হলো। ব্যক্তি সন্তুষ্টির জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত রেলের কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিল তাদের কী হবে?

সবাই জানেন, টিকিট না করে গাড়িতে ওঠা অন্যায়। যাত্রীটি কার আত্মীয় সেটি মোটেও বিবেচ্য বিষয় নয়। তারপরও রেলমন্ত্রীর আত্মীয় জেনেও যদি তিনি যাত্রীদের টিকিট করতে বাধ্য করে থাকেন, তাহলে তো তিনি তিরস্কার নয়, পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এহেন পরিস্থিতিতে কোন বিবেচনায় তাকে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হলো? 

এককালীন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম তার কর্মকাণ্ডের জন্য সারাদেশে অত্যন্ত সুপরিচিত। বহু ক্ষমতাধর অর্থবিত্ত ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির অধিকারী রাঘববোয়ালকে তিনি আইনের মুখোমুখি করেছেন, শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তার কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ দেখে জনগণ যেমন তার প্রতি অনুরক্ত হয়েছে, পাশাপাশি বাহিনী হিসেবে র‌্যাবের প্রতি জনআস্থাও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে, অন্যদিকে নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে অনৈতিক ক্ষমতাশালীরা যে নিমিষেই ক্ষমতাহীন হয়ে যেতে পারে তারও দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুকন্যার আপসহীন মনোভাবে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

হ্যাঁ, এটি নিশ্চিত ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ব্যাক্তিগত শত্রু তৈরি করেছেন। তিন শতাধিক সফল অভিযানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু রাঘববোয়ালের শ্যানদৃষ্টিতে পড়তেই পারেন। ঝুঁকি নিয়ে যারা অন্যায়, অনিয়ম আর অনৈতিকতার বিরুদ্ধে আইনের শাসন বাস্তবায়নে ব্রতী হন, এমন মানুষকে তার কর্তব্যকর্মের জন্য পুরস্কৃত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে সাতাশতম বিসিএসের দুইশ চলিল্গশজন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সারোয়ার আলমকে আটকে রেখে কিসের বার্তা দেওয়া হলো? জনগণ জেনে গেছে ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার শুধু পদোন্নতি বঞ্চিত নয়, জনপ্রশাসনের শৃঙ্খলা পরিপন্থি আচরণের জন্য তিরস্কৃতও হয়েছেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত কতটা সঙ্গতিপূর্ণ? 

কিছুদিন আগে সরকারের এক দায়িত্বশীল কনস্যুলার নীতিমালা নিয়ে এক আজব ফরমান জারি করে বসলেন। যা কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর মতো এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলো। বিভিন্ন মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বিধি-বিধান ধোড়াই কেয়ার করে প্রকাশ্য গণমাধ্যমে তিনি বলতে থাকলেন, কানাডায় তিনি যা চাইবেন সেটিই আইন, বাংলাদেশি কমিউনিটির কে কী ভাবল, তাতে উনার কিছুই যায় আসে না। বিশ্বের কোথায় বাংলাদেশিদের জন্য কী নিয়ম সেটিও তার বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে চাকর-বাকর আর ভৃত্যের মতো আচরণ শুরু করলেন। নানা রকম হয়রানিতে গলদঘর্ম হতে থাকল বাংলাদেশী কমিউনিটি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কানাডার প্রতিটি শহরে চরম বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তিনি আজব ফরমানটি তুলে নিতে বাধ্য হলেন।

এসব আলামত কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। 'অতিভক্তি চোরের লক্ষণ' এটি সবারই জানা; পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডিই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। দেশ-বিদেশে অতিভক্তদের চরম বাড়াবাড়ি দেখে মনে আজ শঙ্কা জাগে। শেখ হাসিনার এত অর্জনের পরও রাজনীতি আর আমলাতন্ত্রে লুকিয়ে থাকা বর্ণচোরাদের অপকর্মে যদি প্রগতির পথটি থেমে যায়, তবে শত বছরেও এর প্রায়শ্চিত্ত হবে অনিশ্চিত। 

বিষয় : অতিভক্তদের চরম বাড়াবাড়ি সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী মো. মাহমুদ হাসান

মন্তব্য করুন