আবারও আরেকটা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে দেশের অতি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ শ্যামনগরে থাকার বিরল ও নিদারুণ অভিজ্ঞতা হলো। এর আগে মহাসেন কি ফণীর সময়েও এখানেই ছিলাম। সিডর, আইলা, বুলবুল ও আম্পানের পরপর আসা হয়েছিল। এবার ৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগরের পথে দুপুরের পর থেকে আকাশ মেঘলা আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। শ্যামনগর থেকে ঈশ্বরীপুর, মুন্সীগঞ্জ হয়ে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কলবাড়ি। সন্ধ্যায় বৃষ্টির ফোঁটা বড় হয়ে যায় আর রাস্তায় ভিড় কমে আসে। ৫ ডিসেম্বর দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি। বিকেলে কিছুটা রোদ ওঠে, কিন্তু রাতে একটানা বৃষ্টি। টানা শীতল বাতাস বইতে শুরু করে। অন্য সময় যতবার এসেছি কলবাড়ি বাজার কিংবা মুন্সীগঞ্জ বাজারে ভ্যান, অটো, সাইকেল আর মানুষের ভিড়ে সরগরম থাকত। দিনে, দুপুর কি সন্ধ্যায় তেমন ভিড় চোখে পড়েনি। রাস্তাঘাটে ছাতা, গামছা কি শীতের কাপড়ে ঢাকা মানুষের মুখ যতটুকু দেখা গেল সেখানে খুব বেশি 'উৎকণ্ঠা' বা 'ভয়ের' ছাপ নেই। গোনাগুনতিতেও পড়ে না এমন কয়েকজন মুখে মাস্ক পরেছেন।
কলবাড়ি বাজারে সকালেই কাঁচা তরিতরকারি আর সুন্দরবনের নদী ও ঘের থেকে আনা মাছের তরতাজা বাজার বসে। ৬ ডিসেম্বর সকালে বাজারটি বেশ পাতলা আর মাছ কিংবা সবজির সমাগমও কম। অগ্রহায়ণ মাসের এই সময়ে অন্য সময় বাজার ভরে থাকে বন আর ঘেরের নানা মাছে। কিছু চিংড়ি, পায়রা, কাইন, ট্যাংরা আর গোটাকতক ভাঙাল মাছ দেখা গেল। বনের মাছের চেয়ে ঘেরের মাছই বেশি। বন থেকে ফেরত আসা জেলে, মৎস্য আড়তদার আর জনাকয়েক ক্রেতার সঙ্গে আলাপ হলো। জানালেন, কয়েক দিনের টানা ঝিরিঝির বর্ষণে নদী কি ঘেরে মাছ ও কাঁকড়া কম মিলেছে। তরিতরকারি নিয়ে বসা বিক্রেতা, কৃষক আর প্রবীণ কতক গ্রামবাসীও জানালেন, কেবল মাছ নয়, এই অসময়ের বর্ষণ কৃষি ফসলের ব্যাপক সর্বনাশ করে দিয়ে যাচ্ছে। আমন মৌসুমের পাকা ধান থেকে শুরু করে আলু, মরিচ ও রবিশস্যের ক্ষতি হয়েছে। আলাপের জটলায় এবার ঢুকে পড়ল কিছু ক্লান্ত, বিমর্ষ মুখ। জানাল, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ঠান্ডা হাওয়ায় তাদের কোনো দিনমজুরি জোটেনি; ভ্যানচালকদের কামাই হয়নি। ক্রমেই বাড়তে থাকা এই ভিড়ে কৃষক, জেলে, দিনমজুর মানুষদের চেহারায় এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল 'উৎকণ্ঠা', 'ভয়'-এর নিদারুণ ছাপ। ভাবলাম, বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাওয়া চশমার কাচ হয়তো এ বিভ্রম তৈরি করছে। বারবার চশমার কাচ মুছে নিলাম। উৎকণ্ঠা আর ভয়ের এই অব্যক্ত ব্যাকরণ পাঠ করতে খুব বেগ পেতে হলো না। কিন্তু মূলধারার দুর্যোগ-কাঠামো দিয়ে এসব 'উৎকণ্ঠা' আর 'ভয়' কখনও পাঠ করা হবে কি?
ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ তো উপকূলের জনপদ লন্ডভন্ড করেনি। তীব্র বেগে আছড়েও পড়েনি; জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সরকারি ভাষ্যে, 'আঘাত' করেনি। কিন্তু জাওয়াদের মতো একটানা বর্ষণ ও বাতাসের কারণে উপকূলীয় জনপদে প্রান্তিক জীবনে যে ভোগান্তি আর ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান তৈরি হয়, তা কিন্তু সেসব পরিবারের জন্য প্রবল সংকট তৈরি করে। খাদ্য, আয়-রোজগার, টিকে থাকা, অর্থনীতি থেকে শুরু করে এমন মাত্রার ঘূর্ণিঝড়ও কিন্তু একেকটা পরিবারকে উকণ্ঠা আর ভয়ের প্রশ্নহীন ময়দানে আছড়ে ফেলে। যদিও আমরা কখনোই এসব ক্ষয়ক্ষতি আমলে নেব না। কিন্তু উপকূলে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা এমন আপদ-বিপদের প্রভাব কোনো দুর্যোগ পরিস্থিতি বা প্রবল সংকট তৈরি না করলেও আমলে নেওয়া জরুরি। কারণ সব আপদ-বিপদ সবার জীবনকে সমানভাবে প্রভাবিত করে না। বিশেষ করে প্রান্তিক জনের জীবনে আপদ-বিপদের যে আঘাত লাগে, তা অধিকাংশ সময়েই 'আড়ালে' থেকে যায়। আজ আপদ-বিপদে সব শ্রেণি-বর্গ-জাতি-লিঙ্গ-পেশার মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি আমলে নিয়ে ক্ষতি সামাল বা ক্ষতিপূরণ, আমাদের সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্রিয় করতে তৎপর হতে হবে।
সুভদ্রা ও গোপালের 'কপালের লিখন'
ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ শুরুর আগে আগে ৩৬০ টাকা দিয়ে কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন কলবাড়ি জেলেপাড়ার সুভদ্রা সানা ও গোপাল সানা। সচরাচর এই জেলে দম্পতি এভাবেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। পাঁচ সদস্যের এই ভূমিহীন পরিবার সরকারি খাসজমিতে চুনা নদীর কিনারে বসবাস করে। অল্প-বিস্তর বৃষ্টি শুরু হলে মালঞ্চ নদীর নিচ থেকে তারা চইলতেবাড়ি খালে ঢোকেন। তিন দিন টানা বর্ষণ ও বাতাস সামাল দিয়ে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরেন। সব মিলিয়ে সাত কেজি ট্যাংরা ও কাইন মাছ পান। কলবাড়ি বাজারে ৬ ডিসেম্বর সকালে মাছগুলো ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। অন্য সময় প্রতিবারের যাত্রায় প্রায় ২৫ কেজি মাছ পান। এমনকি পায়রা, দাঁতিনা, ভেটকি, চিংড়ি, গুলে, ভাঙালসহ মাছেরও বৈচিত্র্য থাকে। পিচ্ছিল, কাদাময় পথ মাড়িয়ে কলবাড়ি ঝুপড়িতে বসে তারা জানান, বর্ষণ ও বাতাসে নদীর ওপরের পানি ক্রমে ঠান্ডা হওয়াতে মাছ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পূর্বমুখী বাতাসের কারণে মাছ কম পাওয়া গেছে। মাত্র ছয় মাস আগে এ বছরের মে মাসেই তাদের সামাল দিতে হয়েছে আরেক ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। সেই সময় ঝড়ের কবলে তারা নদীতে জাল হারিয়ে ফেলেন। ক্ষতি হয় নৌকার। করোনা ও ঘূর্ণিঝড় মিলিয়ে তখন তিন মাস নদীতেই নামতে পারেননি। তার আগে গত বছর করোনাকালে আম্পান ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও চার মাস কাজ বন্ধ ছিল। এর আগে ২০১৯ সালে ফণী ও বুলবুল ঝড়ে ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন কিছুদিন। মহাজন থেকে চড়া সুদে ঋণ এনে কোনোমতে একটা ঝুপড়ি তুলেছেন। তার আগে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ঘরবসতি সব হারালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই খাসজমিতে থাকার বন্দোবস্তি করে দেওয়া হয়। ফিরতি পথে পিচ্ছিল কাদায় টগবগ করে উঠল সুভদ্রা ও গোপালের সংগ্রামী পায়ের ছাপ। জানি সুভদ্রা, গোপাল জানেন না- এই পদচ্ছাপ জোর করে মুছে দিচ্ছে ধনী দেশের লাগাতার বিলাসবহুল ভোগবিলাস আর মুনাফা বাণিজ্য। যার দরুন দুনিয়ায় বাড়ছে কার্বনের জঞ্জাল; পৃথিবীকে করে তুলছে উষ্ণতর; বদলে যাচ্ছে জলবায়ুর ব্যাকরণ। এর ফলেই আজ উপকূলে বাড়ছে এমন ঘূর্ণিঝড়ের প্রাবল্য। যার ভোগান্তি পুরোটাই সামাল দিতে হচ্ছে সুভদ্রা ও গোপালের মতো কার্বনশূন্য জীবনের নিরপরাধ মানুষকে।


ধান সব 'কলা' হয়ে যাবে
শ্যামনগরের কৈখালী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানদের ১০ বিঘা জমিনে ব্রিধান-৪৯ আর বিআর-১০ ধান পেকেছে। কিছু ধান কাটা হয়েছে, কিছু আজকাল কাটা হতো। জাওয়াদের প্রভাবে প্রায় তিন বিঘা জমির ধান পড়ে গেছে। এভাবে ধানের ওজন, রং, গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়। এমন ধানের দাম কমে যায়। প্রায় ২০ মণ ধানের অবস্থা এমন হয়েছে। ঈশ্বরীপুর, মুন্সীগঞ্জ, আটুলিয়া, গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কৃষকরা জানালেন, এমন বর্ষণে জমিনে কেটে রাখা ধানের অঙ্কুরোদ্‌গম হয়ে যায়। বিষয়টিকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয়, কলা হয়ে যাওয়া। কল বা কলা মানে অঙ্কুর। ভুরুলিয়া ইউনিয়নের দেওয়ালদিঘা গ্রামের কৃষক লিলি রানী মণ্ডল জানালেন, তিনি আলুবীজ বুনেছিলেন। জাওয়াদের প্রভাবে প্রায় আলু জমিনই নষ্ট হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের খাসকাটা গ্রামের কৃষক জয়ন্ত মণ্ডল হতবিহ্বল কণ্ঠে জানান, মুলা, ফুলকপি, ওলকপি, শিম, লালশাক, পালংশাক জাওয়াদের কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষকের ফলন ও আয়-রোজগার কিছুটা হলেও কমবে। টানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফলে অধিকাংশ কৃষিজমির মাটি আঠালো পলিময় হওয়াতে বৃষ্টির পানি জমে ফসলের গোড়া পচে ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
জাওয়াদে 'পুর্বে-সর' বইছে
৬ ডিসেম্বর বিকেলে আকাশ মেঘলা হলেও বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু ঠান্ডা বাতাস বইছে। ফিরে আসছি শ্যামনগর থেকে সাতক্ষীরা। রাস্তায় আলাপ শোনা গেল, 'কোনো বাঁধ ভাঙেনি।' আপদ-বিপদ, দুর্যোগ নিয়ে আমাদের মনস্তত্ত্ব এখনও ঔপনিবেশিকতা ও বৈষম্যে বন্দি। যেন কেবল উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে জোয়ারে সব তলিয়ে গেলে আর জানমালের ক্ষয়ক্ষতি পরিসংখ্যান উপচালে আমরা তখন একে 'বিপর্যয়' বা 'দুর্যোগ' হিসেবে দেখছি। কিন্তু প্রতিটি আপদ-বিপদে প্রান্তিক জনের ক্ষয়ক্ষতিকে আন্দাজ করছি না। দুর্যোগ সামালে তৃণমূলের লোকায়ত সংগ্রামকে আমলে নিচ্ছি না। শ্যামনগর থেকে সাতক্ষীরা বাসের আলো-আঁধারিতে মজিবুর রহমান গাজীর বয়ান, মূলধারার দুর্যোগ ভাবনাকে চুরমার করে দেয়। পাঁচ দিন পর সুন্দরবন থেকে তিনি ফিরেছেন শ্যামনগরের হরিনগরে। কদমতলী থেকে পাস নিয়ে দু'জনে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন মালঞ্চ নদীর পাশে উলুবেড়িয়া খালে। পেয়েছেন ৫৫ কেজি। ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন; এক হাজার টাকা কমিশন দিতে হয়েছে। যদি জাওয়াদের প্রভাবে নিম্নচাপ না থাকত তবে প্রায় ৮০ কেজি কাঁকড়া পাওয়া যেত। মাসে দুটি গোণমুখে দু'বার যেতে পারেন কাঁকড়া ধরতে। সুন্দরবনে মাছ ধরলেও এই 'জেলে-বাউলে' আজ ভাড়া ঘর নিয়ে থাকছেন সাতক্ষীরা শহরে। এক সময় সাতক্ষীরা, ঢাকা, রাঙামাটিতে রিকশা চালিয়েছেন। দীর্ঘদিন শহরের বস্তিতে থেকেছেন। গ্রামের বাড়ি ছিল শ্যামনগরের নওয়াবেঁকীর ছোটকূপট গ্রামে। খোলপেটুয়া নদীর কারণে গ্রামের কৃষিজমি ক্রমশ লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন জীবন বাঁচাতে। শহরও তাকে কোনো কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, তাই আদি পেশা সুন্দরবনের কাছে ফিরে গেছেন। কিন্তু প্রতিনিয়ত যেভাবে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে, তাতে তাদের মতো জেলে-বাওয়ালিদের টিকে থাকা কষ্ট। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় জানালেন, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের কারণে 'পুবে-সর' মানে ঝোড়ো হাওয়া পূর্বদিক থেকে বইছে। পূর্বদিক থেকে ঝড় এলে বিপদ বাড়ে। এতে নদীতে মাছ পাওয়া যায় না, ফসলহানি ঘটে। দিনে দিনে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে 'পুবে-সর' বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতিও।
রাত হয়ে গেল সাতক্ষীরা পৌঁছতে; বৃষ্টি নেই। সুভদ্রা, গোপাল, হাবিবুর, মুজিবদের জ্ঞান, ভাষ্য, ক্ষয়ক্ষতি আর সংগ্রামকে আগলে কবে আমরা আমাদের দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা সক্রিয় করে তুলব?
পাভেল পার্থ :গবেষক ও লেখক।
 animistbangla@gmail.com