ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে অগ্রহায়ণে নজিরবিহীন অকাল বৃষ্টিতে সারাদেশে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ সময়ে কখনোই এত বৃষ্টি হয়নি, যা গত তিন দিনে হয়েছে।
বৃষ্টিতে ক্ষেতের পাকা ধান, তোলার অপেক্ষায় পেঁয়াজ, আলু, শীতকালীন শাকসবজি, মরিচ ও গমের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। তবে মাড়াইয়ের জন্য ক্ষেতে কেটে রাখা রোপা আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টিতে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তার তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে তাদের সহায়তা করা হবে। মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আসাদুল্লাহ বলেন, আগামী কয়েক দিনে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (খানি) সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ সমকালকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি থেকে কৃষককে রক্ষায় শস্য বীমা চালু করা উচিত।
ফরিদপুর অফিস জানিয়েছে, জেলার ২০ হাজার ১০১ হেক্টর জমির ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়েছে। কালো সোনাখ্যাত বীজ উৎপাদন করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চাষি শাহিদা বেগম জানান, পানি দ্রুত সরে না গেলে তার ৩৫ বিঘা জমির পেঁয়াজ নষ্ট হবে।
ফরিদপুরে দু'দিনের টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজের। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিস্কাশন না হলে পেঁয়াজে পচন ধরার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তলিয়েছে রসুন, আলু ও সরিষার ক্ষেত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. হযরত আলী জানান, কৃষকদের ক্ষতি পোষাতে অন্য ফসলের প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে এক হাজার হেক্টর জমির ফসল কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খুলনা ব্যুরো ও ডুমুরিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উপজেলা সদরের কৃষক মফিজুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছিলেন। গত শুক্রবার ধান কেটে শুকানোর জন্য মাঠে রাখে। দু'দিনের বৃষ্টিতে সব ধান নষ্ট হয়েছে।
উপজেলার শোভনা গ্রামের কৃষক কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, তার তিন বিঘা জমির ধান গাছ ঝোড়ো বাতাসে মাটিতে পড়ে গেছে।
সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে চার বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করা আটলিয়া ইউনিয়নের বরাটিয়া গ্রামের ইন্দ্রজিত মল্লিক ও রামকৃষ্ণ মণ্ডল জানালেন, ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা এখন নিঃস্ব।
ক্ষতি হয়েছে মাছ চাষে। হরিহরপুর নামে একটি গ্রামেই ভেসে গেছে ৫৫টি মাছের ঘের।
খুলনার আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, ৫ ডিসেম্বর ভোর ৬টা থেকে ৬০ ঘণ্টায় ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অতীতে কখনও ডিসেম্বর মাসে এত বৃষ্টি হয়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অন্তত তিন হাজার ২০২ হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৃষ্টিতে।
কালিয়া (নড়াইল) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চলতি বছর উপজেলায় দুই হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে খেসারি ডাল, এক হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে মসুর ডাল এবং এক হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করা হয়েছে ৬৮০ হেক্টর জমিতে। কৃষকদের আশঙ্কা, কমবেশি সব জমিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে অকাল বর্ষণে। তবে উপজেলা কৃষি বিভাগ বলেছে, ১৭৭ হেক্টর জমির ফসল ও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুড়িচং (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কৃষকরা নালা কেটে পানি নিস্কাশনের চেষ্টা করছেন। উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের মিথলমা গ্রামের জহির ৫০ শতক জমিতে তিনি আলু চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, বৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় দেড় লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার।
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোসাম্মৎ আফরিনা আক্তার বলেছেন, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী ৬৯০ হেক্টর জমির আলু, ৬২ হেক্টর জমির সরিষা, ৫২০ হেক্টর জমির শাকসবজি ক্ষতি হয়েছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।
মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উপজেলা কৃষি অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী আট-দশ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে বহু কৃষক ধান ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারছেন না।
রাজবাড়ী জেলায় অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। পটুয়াখালীর দশমিনায় জোয়ারের পানিতে বাঁধ ভেঙে ৩০০ একর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।


বিষয় : ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাব

মন্তব্য করুন