স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসেও একটি দেশ তার সব নাগরিকের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যখন ব্যর্থ হয়; তখন বিষয়টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা চক্রান্তকারী প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী তৎপরতা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে সামান্যই। এ বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যেসব অঘটন ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ধারা শত শত বছর ধরে বহমান, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কি এবারের ঘটনাতেই বিনষ্ট হলো? বিষয়টি মোটেও সে রকম নয়।

অনেক বছর ধরে সমাজে এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কে বা কারা এবং কীভাবে সমাজে এই ঘুণার বিষ ছড়িয়েছে এবং এখনও ছড়াচ্ছে? এক কথায় হয়তো এর উত্তর মিলবে না, তবে প্রধানত সমসাময়িক কালের ক্ষমতার রাজনীতি এটিকে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে- এ কথা নিশ্চয় বলা যায়। কেননা, সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে যত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের এমন ঘটনা ঘটেছে, তখন রাজনৈতিক সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দায়ী করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত দুস্কৃতকারীকে পাকড়াও করার চেয়ে দলগুলো এর থেকে সুবিধা নিতেই বেশি তৎপর।

অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীকে ধরার নাম করে সময়ক্ষেপণ করেছে সরকারগুলো। এ হলো রাজনৈতিক সরকারগুলোর ব্যর্থতা। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক দলের সুবিধার আড়ালে বছরের পর বছর সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মনোজগতে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে। এখন প্রশ্ন হলো, একবিংশ শতকে এসে যেখানে প্রায় শতভাগ শিশু শিক্ষার আলোয় চলে এসেছে, সেখানে কীভাবে এই অন্ধকার ভাবনা গ্রাস করছে সমাজের অধিকাংশ মানুষের মনোজগৎকে? মূলত আসল সমস্যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এমনটি হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যতটা গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্ব-শ্রমবাজারের জন্য যোগ্য শ্রমিক তৈরিতে, ততটাই উপেক্ষা করেছে একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রগুলোতে।

আমরা বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণ বাঙালি। বাঙালি জাতীয়তাবোধের ধারায় এ রাষ্ট্রের বিকাশ হওয়ার কথা। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বিকশিত হলেও বাঙালি সংস্কৃতি তথা জাতীয়তাবোধের ধারায় কি এ রাষ্ট্র বিকশিত হয়েছে বা হচ্ছে? আমার মতে, মূল ঘাটতি আসলে এখানেই। একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে বাঙালি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অপরাপর সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির মিলনের মাধ্যমে। মোট কথা, এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির উপাদানের সমন্বয়ে বাংলাদেশ নামক দেশটির সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রকাশই হচ্ছে এই মাটির সংস্কৃতি। এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং চর্চা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য।

একটি সমাজ বেড়ে ওঠে তার সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। আর সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সমাজ একটি জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠতে সহায়তা করে। সংস্কৃতিচর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্র কি এই ভূখণ্ডের জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ নিয়েছে? সংস্কৃতি মানে তার ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, উৎপাদন, পোশাক, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। বাঙালি সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, বন্ধুভাবাপন্নতা, অতিথিপরায়ণতা, উপকার এবং উৎসবপ্রিয়তা সর্বদা লক্ষণীয়। একটি জাতিগোষ্ঠী যখন তার নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা ও বিকাশের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলবে তখনই তার জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র প্রকাশিত হবে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের মূল ভিত্তি বাঙালি সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলেও বাস্তবে বাঙালি সমাজের মূল প্রাণ শ্রদ্ধাবোধ, অপর ধর্মের প্র সম্মান, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, উপকারবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনা ও এগুলোর চর্চার অভাব লক্ষণীয়।

অথচ মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া দেশটির সম্ভাবনা ছিল একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার। কেন হয়নি? এই না হওয়ার পেছনে শিক্ষা ব্যবস্থার দায় অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যদি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতির মূল বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে শিশু বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের চর্চা করানো হতো; তাহলে আজ অন্তত এক ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ অপর ধর্মে বিশ্বাসীদের মন্দির ও বাড়িঘরে আগুন দিত না। এখনকার শিক্ষা ব্যবস্থায় মনুষ্যত্ব ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের চর্চার পরিবর্তে শতভাগ পাস এবং গোল্ডেন জিপিএ নিশ্চিতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর সে কারণেই শিশুদের মধ্যে সামাজিকীকরণ যেমন কম হচ্ছে, তেমনি পরমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহিষুষ্ণতার অভাব দেখা দিচ্ছে প্রকট আকারে।

সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ একটি ভালো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষাক্রম তৈরি এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে তা উল্টে গেছে। এ শিক্ষানীতিতে নৈতিক শিক্ষা নামক একটি পৃথক বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে পাঠ্য বিষয় হিসেবে নৈতিকতার পাশাপাশি অপর সব ধর্মের মূল বিষয়গুলো যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়িত হচ্ছে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা নামে পৃথক চারটি বিষয়। সেগুলো হলো ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। খুব মজার বিষয় হলো, প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা কথাটা যুক্ত থাকলেও এখানে মূলত ধর্মীয় বিধিবিধান পাঠ্য করা হয়েছে।

ধর্মীয় বিধিবিধান নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা শিখবে- এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে আন্তঃধর্মীয় জ্ঞান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান, সদাচার এবং নৈতিকতা চর্চার জন্য প্রস্তাবিত নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বিকল্প পাঠ্য বিষয় কি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা/ হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা/ খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা/ বৌদ্ধ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা হতে পারে? কিন্তু বাংলাদেশে এমনটিই হয়ে আসছে ২০১২ সাল থেকে। ধর্মীয় বিধিবিধানের মধ্যে নীতি ও নৈতিকতার বিষয়টি যুক্ত আছে- এ বিষয়টি সত্য। কিন্তু এর বাইরেও নীতি, নৈতিকতা, মানবিকতা, সদাচার, সমাজের ভালো-মন্দ বিষয়টির জন্য নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। শুধু ধর্মীয় বিধিবিধান শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে সদাচার, নৈতিকতা ও মানবতা প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব, তা ভেবে দেখতে হবে।

জাতিরাষ্ট্রের একজন নাগরিক নিজের ক্ষেত্রে যেমন সচেতন তেমনি অপরের ক্ষেত্রেও সমান সজাগ। হোক সে নিজ পরিবার কিংবা অপর ধর্মে বিশ্বাসী অথবা সমাজের কেউ। জাতিরাষ্ট্রের অন্য নাম কল্যাণ রাষ্ট্র। মূলত কল্যাণ রাষ্ট্র অথবা জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো নাগরিককে তার নিজ দেশের সংস্কৃতির উপাদানগুলোর সমন্বয়ে ঢেলে সাজাতে হয় এর শিক্ষা ব্যবস্থাকে। মূলকথা হলো, শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি সমাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির উপাদানগুলো না থাকে তাহলে নাগরিক শিক্ষিত হয় ঠিকই, কিন্তু সুনাগরিক হয়ে ওঠে না। যেমনটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে। আর সে কারণেই বারবার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে অন্য ধর্মে বিশ্বাসীর মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য অপরাধগুলো সংঘটিত হয়।