৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীরা বিদেশের মাটিতে বসে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে চলেছে। পরাধীনতার সেই দুর্বিষহ দিনগুলোই ফিরিয়ে আনতে চায় মানবতাবিরোধী শক্তি। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আলবদরের অন্যান্য যুদ্ধাপরাধী মিলে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় সারাদেশে ১২০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। 

বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চেয়েছিল তারা। নৃশংসতার দিক থেকে একাত্তরের গণহত্যা পৈশাচিকতার অন্যন্য নজির সৃষ্টি করেছে। সেই গণহত্যার কারবারিরা বাংলাদেশের মাটিতেই ফের সমাজসেবার মুখোশ পরে মানুষকে বোকা বানাবার খেলায় মেতে উঠেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নিতেই একাত্তরের পৈশাচিক ঘটনায় যুক্তরা পাকিস্তানের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে অপরাধীরা তো চিরকাল অপরাধীই থাকে। তাদের মন থেকে অপরাধপ্রবণতা মোছে না কখনও। সেই মানসিকতা থেকেই মানবসেবার নামে মানবতাবিরোধী মুঈনুদ্দীনরা গঠন করে 'মুসলিম এইড'। বিভিন্ন দেশে মানুষের সেবার নাম করে তারা এঁটে চলেছে নতুন নতুন ফন্দি। এই সংস্থার মূল হোতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে বিশেষ আদালত মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়। তবে আইনের চোখে সে পলাতক।

১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যায় মুঈনুদ্দীন। সেখানকার নাগরিকত্বও নেয়। তারপর ১৯৮৫ সালে তারই পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয় মুসলিম এইড। মুঈনুদ্দীন 'মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন' প্রতিষ্ঠায়ও মুখ্য ভূমিকা রাখে। ব্রিটেনের এই সংগঠনটির সঙ্গে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর সখ্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, মুসলিম এইডের আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বসনিয়া, সুইডেন, এমনকি বাংলাদেশে শাখা প্রতিষ্ঠা করার পেছনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মঈনুদ্দীনই মূল চালিকা শক্তি।

করোনা অতিমারির সময়ও সংগঠনটি সামাজিক মাধ্যম ও কতিপয় সংবাদ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে গরিব মানুষের উপকার করার নামে টাকা তুলছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে টাকা দান করতে উৎসাহিত করলেও সেই টাকা গরিব মানুষের কাজে লাগছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার নামে অ্যাম্বুলেন্সের ভুয়া ছবি ব্যবহার করে তারা। সেটি অবশ্য ধরা পড়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মুসলিম এইড বহুকাল ধরেই মানবসেবার নামে মূলত জঙ্গিবাদীদের সাহায্য করছে। মুসলিম এইড মুসলমানদের উন্নয়নের কথা বললেও তাদের সংগৃহীত অর্থ কোথায় খরচ হচ্ছে সে প্রশ্নের জবাব মেলে না। সংস্থাটি তাদের কাজকর্মে এটাই প্রমাণ করে চলছে যে, তারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও তাদের উত্তরাধিকারী।

সংস্থাটির সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সখ্যও স্পষ্ট। মুসলিম এইডের ইউকে শাখার সদস্য ফারুক সলমান মুরাদের সঙ্গেও জামায়াতের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তার বাবা খুররাম ঝা মুরাদ এবং আরেক যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী আলবদরের নেতা ছিল। পাকিস্তানি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ছিল খুররাম। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ইউকের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবেও কাজ করেছে মুরাদ। তার থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটি পরীক্ষা করতে ১৫ জন বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে মুরাদ। পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতার ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদীই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে আনে।

১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহানের হাত ধরে বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয় মুসলিম এইডের বাংলাদেশ শাখা। আবদুস সোবহান নিজেও একজন যুদ্ধাপরাধী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনায় গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, লুট প্রভৃতি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সে জড়িত ছিল। ২০১২ সালে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে অবশ্য সব দোষ অস্বীকার করে। ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী সোবহান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেলেও মুসলিম এইড থেমে নেই।

বাংলাদেশে মুসলিম এইড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে একাধিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। যশোর, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় মুসলিম এইড ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি রয়েছে। অথচ ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) এবং ডিফেন্স ফোর্স ইন্টেলিজেন্স ২০০৫ সালেই জঙ্গিবাদীদের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্তদের তালিকায় মুসলিম এইডকেও যুক্ত করে। এখনও সংগঠনটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৭ সালে কপবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সরকার মুসলিম এইডের ইউকে শাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে বাংলাদেশ শাখা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। দেশের ৬৩ জেলায় ১২০০ কর্মী নিয়ে তারা সক্রিয়তা বজায় রেখেছে। মুসলিম এইডের ওয়েবসাইটে গেলেই যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা, জামায়াত ও আলবদরের মতো গণহত্যাকারী ও তাদের উত্তরসূরিরা সক্রিয় থাকবে?