ইসলাম ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে কোরবানি। ত্যাগের দীপ্ত মহিমায় সমুজ্জ্বল ঈদুল আজহার ইতিহাস। পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে বর্ণিত আছে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর অন্যতম নবী। প্রেরিত পথপ্রদর্শক। তিনি ইমানের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে খলিলুল্লাহ উপাধি লাভ করেন। তিনি স্বীয়গোত্রীয় রীতিনীতি হিসেবে নিজেকে স্রষ্টার বাণীবাহক রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তার ওপর পরম করুণাময় স্রষ্টার শাশ্বতবাণী ভেসে এলো 'কোরবানি দাও। কোরবানি দাও তোমার প্রিয় বস্তুকে।' 

তিনি ভাবতে লাগলেন তার সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী হতে পারে। তার বার্ধক্যের দোরগোড়ায় জন্ম নেন হজরত ইসমাইল। জীবনের শেষ প্রান্তে লাভ করা পুত্র যে কতটুকু প্রিয় হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার হৃদয়ের অতল গভীর থেকে উঁকি মারল প্রিয় পুত্রের প্রতিচ্ছবি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পুত্রকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কোরবানি করবেন। ইব্রাহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী হজরত হাজেরার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন ইসমাইল। পিতার কাছ থেকে কিশোর ইসমাইল আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে অবহিত হন। না, একটুও বিচলিত হননি তিনি। তিনিও যে স্রষ্টার প্রেমে নিজের হৃদয় উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তাই দেহের কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। প্রকৃত প্রেমিক তার প্রেয়সীর সুখের পথ মসৃণ করতে যেভাবে তাকে ত্যাগ করতে পারে, ইসমাইল সেভাবে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজের দেহের, জীবনের বিসর্জন দিতে একটুও পিছু হননি। হজরত ইব্রাহিম পুত্রকে কোরবানি করতে নিয়ে গেলেন নির্জন মিনা প্রান্তরে।

নিজ হাতে কোরবানি করবেন আর পুত্র নিজের ইচ্ছায় জীবনের প্রজ্বলিত প্রদীপ নিভিয়ে দেবেন, তা হয় না। তাই স্রষ্টা কেড়ে নেননি ইসমাইলের জীবন। হৃদয়ে পাথর চাপা দিয়ে পিতা পুত্রের গলায় সজোরে ছুরি চালালেন। চোখ খুলে দেখেন পুত্রের জায়গায় কোরবানি হয়ে আছে একটি জন্তু। চতুষ্পদ প্রাণী দুম্বা। সেই থেকে রচনা হলো ত্যাগের ইতিহাস। তাই শত শত বছর ধরে মানুষ সেই ত্যাগের স্মরণ করছে। সেই থেকে শুরু কোরবানি। কোরবানি করা 'ওয়াজিব'। হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। যারা মক্কায় হজব্রত পালন করতে যান তারা মিনা প্রান্তরে সম্পাদন করেন কোরবানি। ইসলাম ধর্মের মূল পাঁচটি অবশ্যকরণীয় কাজের মধ্যে হজ অন্যতম, তা শুধু বিত্তশালীদের ক্ষেত্রে। কোরবানির মাংস তিনভাগের একভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়, যাতে সেও উপভোগ করতে পারে ঈদের আনন্দ।

কিন্তু পশু কোরবানি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। পশু কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়াই হলো প্রকৃত কোরবানি। হত্যা করতে হয় মানুষের রিপুকে। কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি পরিহার করতে হয়। মানুষের রক্তের মধ্যে বিরাজমান পশুত্বকে বর্জন করে প্রকৃত আত্মশুদ্ধির নামই কোরবানি। তবেই আসে ঈদের প্রকৃত আনন্দ।

ঈদের সকালে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যাত্রা করেন ঈদগাহ প্রান্তরে। সেখানে দুই রাকাত ঈদের নামাজ পড়েন। তারপর শুরু হয় সমবেত প্রার্থনা, সম্প্রীতির প্রার্থনা, শান্তির প্রার্থনা। এরপর একে অন্যের সঙ্গে, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। হিংসা ও ঘৃণার প্রাচীর চুরমার হয়ে যায়। ঈদ এসেছে শান্তি, ঐক্য আর প্রেমের সওগাত নিয়ে। স্বর্গ থেকে নিয়ে এসেছে স্নিগ্ধপরশ আর ভালোবাসার বার্তা। নিয়ে এসেছে স্বপ্নিল স্বর্গের আনন্দ। কিন্তু ঈদের আনন্দ ম্লান করে দেয় মাতৃভূমির আরও এক সন্তানের তাজা রক্ত। পুত্রহারা মায়ের কান্না, বিরহ যন্ত্রণা। ধর্মের নামে, জাতপাতের নামে, হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে মানুষ খুন করেছে মানুষকে। যারা ইসলাম শব্দ ব্যবহার করে সংগঠন তৈরি করে মানুষকে খুন করে, যারা 'জিহাদ' শব্দের দোহাই দিয়ে রক্ত ঝরায়, তাদের কাছে ঈদের কোনো অর্থ নেই বা তারা মুসলমান নয়। নবী করিম (স.) বলেছেন, মাতৃভূমিকে ভালোবাসা ইমানের অঙ্গ। বলেছেন, যারা মানুষকে খুন করবে সে যে ধর্মেরই হোক, সে বেহেশেতর সুগন্ধও পাবেন না। সুতরাং নানাবিধ অপকর্ম আর প্রতারণা, কালোবাজারি করে যারা রিহার্সাল চালিয়ে আবার ঈদ পালন করে তাদের কাছে ঈদের কোনো অর্থ নেই।

সম্প্রীতি আর ত্যাগের মহান আদর্শকে সামনে রেখে আজকের দিনে সবাই জাতি-ধর্মের গণ্ডির ভেদ করে চলুন আমরা হাতে হাত, হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়ে বিশ্বপিতার অনুপম সৃষ্টির সীমাহীন মুক্তাঙ্গনে একাকার হয়ে যাই। প্রেম আর কল্যাণের সিঁড়ি বেয়ে মাটির পৃথিবীতে স্বর্গের স্বপ্নিল ছোঁয়া নিয়ে বারবার ফিরে আসুক মিলনের উৎসব, কল্যাণের উৎসব, একতার উৎসব। আমরা যেন মনে রাখি- 'আপনার লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেন অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।'

বিষয় : ইদুল আজহা কল্যাণ ও সংহতির উৎসব

মন্তব্য করুন