ডিজিটাল আসক্তি বলতে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি এমন মোহ বা টান যা ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল  প্ল্যাটফর্ম তথা ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন, মোবাইল অপারেশন, ডিজিটাল গ্যাজেট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেশাগ্রস্ত করে রাখে।

এককথায়, ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অনলাইন কার্যক্রমে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে যা তার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা থেকে বিরত রাখে এবং তার স্বাভাবিক আচার-আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল আসক্তির তিনটি ধরন রয়েছে; যথা- ফোন আসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। সব বয়সের মানুষের মধ্যে এ আসক্তি দেখা দিলেও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা এ আসক্তিতে বেশি আক্রান্ত।

ছাত্র, শিক্ষকসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বর্তমানে ফেসবুকের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখতে অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্মই একমাত্র অবলম্বন। কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে বসতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ক্লাসের অন্তরালে ঝুঁকে পড়ছে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিনোদনে যা তাদের মারত্মকভাবে আসক্ত করে তুলছে। অনলাইন গেম ও ফেসবুক এগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ও অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকছে। অনলাইনে পড়ানোর সময় ইন্টারনেটে শিক্ষকদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ফোন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবে ছবি ও গানের প্রতি তাদের আসক্তি বাড়ে এবং কখনও কখনও ফেসবুক চ্যাটিংয়ে যুক্ত হয়ে যায়।

এখন শিক্ষার্থীরা বিনোদনের জন্য অনলাইন গেম পাবজি এবং ফ্রিফায়ার বেছে নেয়। ঘরের এক কোণে বসে মাতাল হয়ে অনলাইনে ভিডিও গেম খেলছে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাদের সময় পার করছে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও গেমগুলো হলো- পাবজি এবং ফ্রিফায়ার, যা আজকাল সবচেয়ে বেশি খেলতে দেখা যায়। পেল্গয়ার অজানা ব্যাটেল গ্রাউন্ড (পিইউবিজি), দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ব্লু-হোয়েলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্বারা বিকশিত একটি খেলা পাপজি এবং ফ্রিফায়ারের মতো অনলাইন গেম শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব পরিসংখ্যানগুলোতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এ দুটি গেম সবচেয়ে বেশি খেলছে। একাধিক সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৮৭ কোটি ছেলেমেয়ে প্রতিদিন পাবজি এবং ফ্রিফায়ার খেলছে। গুগল প্লেস্টোর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ডাউনলোড করা হচ্ছে। অন্য একটি অনলাইন সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশিবার এ গেম খেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ প্রতিদিন ফ্রিফায়ার গেমটি খেলছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ খেলছে। অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, কিশোর এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের ৮.৬ শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্ত। এর মধ্যে ৪.৮ শতাংশ কিশোর এবং ১.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

অস্ট্রেলিয়ার ডায়াকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেন ইয়ং তার নিবন্ধ 'ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফার-রাইটস'-এ লিখেছেন, সন্ত্রাসভিত্তিক ভিডিও গেমগুলো সন্ত্রাস-হিংসাকে সাধারণীকরণের ষড়যন্ত্র। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ অপরাধবোধকে উস্কে দিচ্ছে। তরুণদের হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে ভাবাতে শেখানো হচ্ছে। মানুষের মধ্যে নৈতিকতা নষ্ট হচ্ছে। এমনকি রাস্তায় কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলেও এখন কেউ সামনে আসে না। গেম নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য হলো- ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি করা। আসলে বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন কিশোর ছাত্রছাত্রী ভিডিও গেমে আসক্ত। ফলস্বরূপ সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অক্ষম হয়ে গড়ে উঠছে। এই আসক্তি তাদের সৃজনশীল শক্তিকে দুর্বল করছে। আসক্তি কখনও কখনও আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথে ডেকে নিচ্ছে। ২১ মে, শাহজাহানপুরে মোবাইল ফোনে ফ্রিফায়ার গেম খেলতে না পারায় উম্মে হাবিবা বর্ষা নামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল।

এই গেমগুলো খেলতে পর্যাপ্ত ডেটা প্রয়োজন, যার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। সম্প্রতি, দিনাজপুরের বিরামপুরে ফ্রিফায়ার ডেটা কিনতে অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারায় রিপন নামের এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছিল। বাংলাদেশের একটি অনলাইন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের কারণে এ বছর প্রায় ১৭ জন আত্মহত্যা করেছে। অনলাইন গেমগুলোর আসক্তির কারণে আত্মহত্যার তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ভিডিও গেমের আসক্তি মাদকের চেয়ে মারাত্মক। তারা এর নাম দিয়েছিল 'ডিজিটাল ড্রাগ'। একজন মাদকসেবী মাদক না পেলে, নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়; একইভাবে, অনলাইন গেম আসক্তরা গেমটি খেলতে না পেরে আত্মহত্যা করতেও দ্বিধা করে না। মাদকের আসক্তির মতো, অনলাইন গেম থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। তবে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা পরিষেবায় নিজেকে জড়িত রেখে গেমের আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এ ধরনের গেমগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনা করে ভারত, নেপাল, জাপান, ইরানসহ অন্য অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও পাবজি এবং ফ্রিফায়ার গেমস নিষিদ্ধ করেছে। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদৃশ্য কারণে এটি থামানো যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে যদি আসক্তি থেকে মুক্তি দেওয়া না যায়, তবে তাদের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

শিগগিরই বাংলাদেশে এই সন্ত্রাসভিত্তিক গেমস বন্ধ করা জরুরি। তদুপরি, বাচ্চাদের এ জাতীয় আসক্তি থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের অনলাইন বিশ্বে শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন নিশ্চিত করতে হবে, তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় জড়িত হতে উৎসাহিত করতে হবে, ফেসবুকের ভালো ও শিক্ষণীয় স্টোরিগুলো ব্যবহারে নির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করতে হবে। সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক এ জাতীয় বিনোদন ব্যবহারে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ জারি করতে পারে, এমনকি বিটিআরসি নেট গতি দুর্বল করে তাদের এ জাতীয় গেম খেলতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা নীতি বজায় রেখে খেলার মাঠে যেতে এবং খেলার ব্যবস্থা করতে দেওয়া উচিত। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বিশ্বে তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য মাদকের আসক্তিকে আমরা 'না' বলার পাশাপাশি ডিজিটাল আসক্তিকে আমাদের 'না' বলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে- এখন ক্ষতটি ছোট, এটি ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যাবে, তবে ক্ষতটি বড় হয়ে গেলে তা নিরাময় করা কঠিন হবে। সুতরাং আসুন সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনি এবং অনলাইনভিত্তিক সব গেম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করি। শিক্ষক, বাবা-মা এবং আপামর জনসাধারণ সবাই যদি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে, তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।

বিষয় : শিক্ষার্থীদের অনলাইন গেম

মন্তব্য করুন