মানুষের শেষকৃত্যেও কিছু উপকরণ লাগে, সুতরাং সেখানে ব্যবসা আছে। একশ্রেণির বেনিয়া সেটা বোঝেন বলে তারা দুঃসময়েরও উপাসক! প্রতিকূল পরিস্থিতি তাদের জন্য অর্থ কামানোর মওকা। করোনা মহামারিতে টুপটাপ মানুষ মরলেও কিছু 'কারবার' তাই ফুলে-ফেঁপে ওঠে। পুঁজির রমরমায় চাপা পড়ে আত্মাহুতি। মহামারিকালে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির খবর তারই নিখাদ ঘোষণা, আরেক দফায়। অর্থাৎ সংঘাত-সহিংসতা হোক, চাইকি প্রকৃতির মার, মানুষের প্রাণহানি অস্ত্রের চাহিদা কমায় না, জোগানে ভাটা পড়ে না।

করোনা মহামারি শুধু হাজারে-বিজারে মৃত্যুই ঘটাচ্ছে না, লাখো কোটি মানুষের পেটে টান দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, সংক্রমণ থেকে কোনো না কোনোভাবে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব হলেও জীবিকার সংকট কাটছে না। অর্থনীতি দারুণভাবে সংকুচিত। এ অবস্থায়ও সামরিক ব্যয় তো কমেইনি, উল্টো বেড়েছে। আপৎকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অটুট ক্ষমতা নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছেন ক্ষমতাসীনরা।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিচ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বে সামরিক ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বিপরীতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যয় ঊর্ধ্বগামী রাখার অর্থ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানো। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় সংকটে পড়েনি বিশ্ব। এবং যেহেতু এই সংকট 'প্রকৃতিসৃষ্ট', তাই এমন নয় যে প্রকৃতির সঙ্গে চাইলেই জরুরি বৈঠক ডেকে শান্তিচুক্তি সই করা যাবে। যদিও এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র 'মারণাস্ত্র' প্রকৃতির খাপ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার দায় নাকি মানুষেরই। তবু কিন্তু মানুষ জানে না, কবে কোন ক্ষণে করোনাকে পরাস্ত করা যাবে। জ্ঞানবিজ্ঞানে যে অগ্রগতি, এরই মধ্যে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক টিকার আবিস্কার অবশ্যই আশাবাদী করে। কিন্তু রাতারাতি যে করোনামুক্তির পয়গাম প্রচার যে সম্ভবও নয়, তা স্পষ্ট। আর টিকা নিয়ে চিরকালের ধনী-গরিব বিভাজন রেখা পুনরায় যেভাবে জেগে উঠেছে, তাতে পৃথিবীর একদিকে সুরক্ষাপ্রাচীর তৈরি হলেও অন্যপ্রান্তে যে আরও বহু প্রাণাঞ্জলি অব্যাহত থাকবে, তাও স্পষ্ট।

এমন দুঃসময়তাড়িত বিশ্বে এর কাণ্ডারিদের শৌর্য-বীর্য ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে যতই অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক বলা হোক, পৃথিবীর এই পরিণতির রূপরেখা এক দিনে রচিত হয়নি। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় বেড়েছিল ৪ শতাংশ, যা আগের এক দশকের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বার্ষিক প্রকাশনা দ্য মিলিটারি ব্যালেন্সের এই হিসাবই বলে দেয়, বিশ্বের বুকে অস্ত্রের ঝনঝনানি থামার নয়। করোনাকালেও যে তা তাল হারাবে না, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

নানা ফন্দিফিকিরে জিইয়ে রাখা দুনিয়ার দশ দিকের সংঘাত-সহিংসতায় হাজারো মানুষের প্রাণহানির সঙ্গে শামিল করোনায় শবযাত্রা- শুধু জীবনের বিপুল অপচয় নয়, অর্থেরও অগাধ শ্রাদ্ধ। কিন্তু প্রতিবেশীর ঘরের আগুনে আলু পোড়া দিয়ে খাওয়ার 'লাভ'টাও এখানেই। অস্ত্র বাণিজ্যের লাভ। টিকা বাণিজ্যেরও লাভ। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লাভ। বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অবশ্য সামরিক তাকত বাড়ানোর অপর নাম 'প্রতিরক্ষা ব্যয়'। নিজেকে রক্ষার অধিকার কার না আছে, এই যুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজেকে সুরক্ষিত রাখার নামে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালছে, গড়ে তুলছে আজদাহা সব অস্ত্রভান্ডার। কিন্তু কে কার কাছে অরক্ষিত? এই সুরক্ষা আদতে অন্যকে ঘায়েলে সামর্থ্যবান হওয়া, নিজের সক্ষমতা জাহির করা। তাই অস্ত্রের চাহিদা ও জোগানে রক্তপাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। করোনা আজ আছে, কাল থাকবে না- ক্ষমতা চিরকালের!


মন্তব্য করুন