এবারের বইমেলার আয়োজন অন্য কোনো বছরের চেয়ে ভিন্ন, করোনা মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনেই এগিয়ে চলেছে বইমেলা। নেতিবাচক সমালোচনা আর মেলার ভেতর-বাইরে স্বাস্থ্য সুরক্ষার কড়াকড়ি সংগত কারণেই দর্শক খরা চলছে। আমার ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পেতাম শুধু গ্রীষ্ফ্মের ছুটিতে। বাবা পিটিআই শিক্ষক ছিলেন, বাড়িতে আসার সময় ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরি থেকে ইস্যু করে এক মাসের জন্য গুটিকয়েক গল্পের বই নিয়ে আসতেন। বই পেয়ে সে কি আনন্দ! ঠিক এক মাস পরে ফেরত নিয়ে যেতেন, মনে খুব কষ্ট হতো; কারণ তখনও যে পড়া শেষ হয়নি।

বইমেলা হবে কি হবে না এমন দোলাচলে যখন বাংলা একাডেমি, করোনা মহামারি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় আয়োজকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়েই সামাজিক দূরত্ব যথাযথ বজায় রাখতে কয়েকগুণ বেশি জায়গা নিয়ে উন্মুক্ত স্থানে বইমেলার আয়োজন করেন। কিন্তু হঠাৎ করোনা মহামারি বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় সরকার সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করে। তারই অংশ হিসেবে প্রতিদিন মেলার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বইমেলা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যেভাবে লেখালেখি ও সমালোচনা হচ্ছে, একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। বিশেষত সীমিতভাবে হলেও কলকারখানা, অফিস, ব্যাংক, বীমা, বাংলাদেশ গেমস এমনকি হাটবাজার খোলা আছে। সরকার তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা জানুয়ারি উৎসবের আমেজে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবইও তুলে দিয়েছে।

বইমেলা প্রাণের মেলা, মননশীল লেখক-পাঠক, শিশু-কিশোর তথা শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পীঠস্থান এ মেলার আজকের ব্যাপ্তি দিনে দিনে তৈরি হয়েছে, প্রকাশক-লেখক-পাঠকের মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে এ বইমেলাকে ঘিরে, লেখকের মুক্তচিন্তা উচ্চমার্গের মননশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এ বইয়ের মাধ্যমেই তুলে দেন পাঠকের হাতে। বইমেলাকে উপলক্ষ করেই প্রকাশকরা পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, লেখকদের লেখা জমা দেওয়ার জন্য তাগাদা দেন, লেখকভেদে অগ্রিম সম্মানীও দিয়ে থাকেন। এতসব প্রচেষ্টার একটাই উদ্দেশ্য, পাঠকদের হাতে ভালো বই উপহার দেওয়া। বইয়ের পাতায় পাতায় লুকায়িত থাকে শিক্ষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক সত্যসহ অপরিমেয় জ্ঞানভান্ডার। বইমেলা আয়োজন করতে গিয়ে প্রকাশকরা অনেক শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেন, হুট করে যেমন বইমেলা আয়োজন করা যায় না, তেমনি বিকল্প ব্যবস্থা না করে মেলা বন্ধ করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। এ জন্য সরকার সব মানসম্মত বই বিশেষত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক গ্রন্থনাসহ সর্বোচ্চসংখ্যক লেখকের অধ্যবসায়লব্ধ অধিকাংশ সুখপাঠ্য গ্রন্থ ক্রয় করে দেশের সব স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিসহ সব পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রদান করতে পারেন। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রতিদিন পাঠক সংখ্যা ও প্রত্যেকের মেলা অভ্যন্তরে অবস্থানের সময়কাল নির্দিষ্ট করে দেওয়া যেতে পারে, এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যাবে। দীর্ঘদিন যেহেতু স্কুল-কলেজ বন্ধ তাই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে মানসম্মত বই অনলাইন ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বল্পমূল্যে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। কারণ আগামী কয়েক বছর হয়তো আমাদের করোনা মহামারি নিয়েই চলতে হবে।

সুস্থ ধারার সংস্কৃতিচর্চা তথা কিশোর-তরুণদের মানস গঠনে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম আর নতুন নতুন বই প্রাপ্তির প্রধান উৎস বইমেলা। এ ক্রান্তিলগ্নে একটি ভালো বই হতে পারে অনেক হতাশা মোচনের হাতিয়ার, বাংলা নববর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার। তাই সুরক্ষা নিশ্চিত করে সীমিতভাবে হলেও বইমেলা সাময়িক বিরতি দিয়ে আরও কয়েকদিন এগিয়ে নেওয়া যায় কিনা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।


মন্তব্য করুন