করোনা মহামারিতে এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু রেখেছে; যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অনলাইন ক্লাস কখনও বাস্তব ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না। তবুও মন্দের ভালো হিসেবে সবাই চালিয়ে যাচ্ছে।

গত বছর নভেম্বর মাস থেকে করোনার সংক্রমণ কমে আসা এবং করোনার টিকার প্রয়োগ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করে। সরকারও সবদিক বিবেচনা করে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩০ মার্চ ২০২১ তারিখে সীমিত আকারে চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাস্তবতা হচ্ছে কয়েকদিন থেকে প্রতিদিন করোনার নতুন সংক্রমণের হার অতীতের রেকর্ড ভেঙে বেড়েই চলেছে। অবস্থা পর্যালোচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জরুরি মিটিং করে বলতে বাধ্য হচ্ছে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মার্চের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঈদের পর সমন্বয় করে ২৩ মে খোলা হতে পারে।

কিন্তু করোনার এই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কি ঈদের পর কমে আসবে? যদি কমে না আসে তবে কি হবে? স্বভাবতই করোনা থেকে শিগগিরই মুক্তির কথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। সংক্রমণের উচ্চহার আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বেড়ে চলেছে। ইউরোপের কিছু দেশে চলছে তৃতীয় বারের মতো লকডাউন। বাংলাদেশে গত বছরের জুন মাস থেকে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান সবই চলছে, শুধু চলছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষা পরিবার বলতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রকাশক এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক সবাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে আমরা কিছুটা হলেও বাঁচতে পারব। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক অনেক কষ্টে অনলাইন কার্যক্রম চালু রেখে শিক্ষকের বেতন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ জোগাড় করছেন। কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষক এবং কর্মচারীরা বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক অবদান আছে। তাই পুনরায় শিক্ষাক্রম চালু করতে সরকারের বিশেষ প্রণোদনা খুবই দরকার।

করোনার টিকার জন্য সবাই অপেক্ষা করেছিল। টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্তের খবরে সবার মাঝে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। এছাড়াও করোনার নতুন নতুন ধরন মানুষকে হতাশ করছে। যদিও গবেষণায় জানা যাচ্ছে, টিকা নেওয়ার পর করোনা সংক্রমণ হলেও মৃত্যু ঝুঁকি কমে আসবে। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকদের টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়ার জন্য আহ্বান করেছে।

সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত না করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সরকার লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে নতুন বছরে নতুন বই সময়মতো বিতরণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় ফের দেখা দিচ্ছে সেশনজট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু হয় গত বছর জুলাই থেকে। নানান প্রতিকূলতার মাঝেও অনেকে ক্লাসে অংশগ্রহণ করে কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন বর্ষের কিংবা সেমিস্টারের কোর্স শেষ হলেও পরীক্ষার আয়োজন করা যাচ্ছে না। ফলে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। কোনো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ হওয়া কোর্সের পরীক্ষা না নিয়ে পরবর্তী সেমিস্টারের কোর্স পড়ানো শুরু করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জোর করে ক্লাস করানো যায়, পড়াশোনা করানো যায় না। শিক্ষার্থীদের পক্ষে দুই সেমিস্টারের কোর্স একসঙ্গে অধ্যয়ন করা কিংবা পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়াও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাস অনলাইনে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই অনুষদের শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় অনেক দীর্ঘ সেশনজটে পড়তে পারে। তাই দরকার সঠিক পরিকল্পনা যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য কার্যকর কিছু হবে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় করোনাকালীন একটা সেমিস্টার শেষ করেছে যেখানে ব্যবহারিক এবং তত্ত্বীয় কোর্স ছিল। তারা বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেন দীর্ঘায়িত না হয়, সেই উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের মতো সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে উচ্চশিক্ষায় সেশনজট মুক্ত করে পড়াশোনা স্বাভাবিক রাখা যায়। এটা সবার জন্য এক হবে তা নয়, সবার অবস্থান বিবেচনা করে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গত ১৩ মার্চ সীমিত আকারে শুধু পরীক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল খুলে পরীক্ষার আয়োজন করতে চেয়েছিল, যদিও নানান কারণে তা সম্ভবপর হয়নি। প্রয়োজনে বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-কার্যক্রম কীভাবে চলছে তা বিবেচনা করে সময়ের চাহিদা অনুসারে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গভীর পর্যালোচনা করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় অতি সম্প্রতি অনেক কষ্টে অর্জিত উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ভবিষ্যতে বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। দক্ষ এবং শিক্ষিত জনশক্তির ওপর নির্ভর করছে দেশের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা।


মন্তব্য করুন