চল্লিশের দশকে প্রখ্যাত মনীষী এস ওয়াজেদ আলী এমন একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন- বলেছিলেন, এই জাতি একজন মহামানবের প্রতীক্ষায় আছে। তিনি আরও বলেছিলেন, 'এখন বাঙালি কেবল ভারতবর্ষে নয়, কেবল প্রাচ্য ভূখণ্ডের নয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শক হবে- সত্য, সুন্দর, শুভ জীবন-পথের।' কী আশ্চর্য, চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশক- মাত্র দু-দশকের ব্যবধানে এমন একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

যুগে যুগে বিশ্বের নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জনাকয়েক মহাপুরুষ। তাদের দিকনির্দেশনামূলক ভাষা মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। তাদের ভাষণ পাল্টে দিয়েছে একটি দেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের অন্যতম শীর্ষজন। স্মরণ করি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কাব্যপঙ্‌ক্তি- ঐ মহামানব আসে,/ দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/ মর্তধূলির মতো ঘাসে ঘাসে।/ সুরলোকে বেজে উঠে শঙ্খ,/ নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক/এল মহাজন্মের লগ্ন।/

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমুদ্রে বজ্রকণ্ঠে কালজয়ী ভাষণ দেন। তিনি ঘোষণা দেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' এই ডাক ছিল মূলত স্বাধীনতারই ডাক।

এ ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসগোষ্ঠীর শোষণ-শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালির সঙ্গে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দিকনির্দেশনা ছিল- 'প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।' ৭ মার্চের ভাষণ শুনে বাঙালি আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায়। এ ভাষণের পরেই বাঙালি জাতির সামনে একটি মাত্র গন্তব্য নির্ধারিত হয়ে যায়, তা হলো 'স্বাধীনতা'।

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ অঞ্চলের জনগণের ওপর নেমে আসে নিপীড়ন আর নির্যাতনের জাঁতাকল। বৈষম্য প্রকট রূপ লাভ করে। শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মাতৃভাষা উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই মূলত শুরু হয় বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। '৫২-র ভাষা আন্দোলন, '৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, '৬৬-র ৬ দফা আন্দোলন, '৬৯-র গণঅভ্যুত্থান এবং '৭০-র সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পথ ধরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে ধাবিত হয়। এসব আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ জনতার সামনে তেজোদীপ্ত জ্বালাময়ী কাব্যিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি এ বক্তৃতায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে 'বাংলাদেশ' শব্দ ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ নতুন রাষ্ট্রের নামকরণ চূড়ান্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ বাঙালির মনোবল, শক্তি-প্রেরণা অধিকতর পুষ্ট করে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে। এ ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার মানুষ বর্ণ-গোত্র ভুলে গিয়ে দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন দিতে শপথ নিয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে লাল-সবুজের পতাকা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। ২০১৭ সালের ২৪-২৭ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো ১৩০টি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, নথি ও বক্তৃতা যাচাই-বাছাই করে ৭৮টি বিষয় সংস্থার মেমোরি অব দ্য ওয়াল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে। এরপর ৩০ অক্টোবর ২০১৭ ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ওয়াল্ড'স ডকুমেন্টারি হ্যারিটেজের মর্যাদা দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়াল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্যতম।

এটাই ইউনেস্কোর এ যাবৎ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৪২৭টি প্রামাণ্য ঐতিহ্যের মধ্যে প্রথম অলিখিত ভাষণ। এ ভাষণকে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এর শ্রেষ্ঠত্ব, গুরুত্ব এবং বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস এখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, বিশ্বব্যাপী গবেষণা হচ্ছে। এটি এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সারাবিশ্বের সম্পদ, আমাদের বড় অর্জন। কেননা বিশ্বের খুব কম জাতিরই গৌরব করার মতো এমন সর্বজনীন নেতা ও এমন ঐতিহাসিক দলিল আছে, যা বৈশ্বিক স্বীকৃতির মর্যাদা লাভের যোগ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে কত বড় মাপের বিশ্বনেতা এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণ হলো বিশ্ব দরবারে।

জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

মন্তব্য করুন