গাণিতিক সূত্র যেমনভাবে জটিল সমস্যার সহজ সমাধান আনতে পারে, তেমনিভাবে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সূত্রও মানবের মুক্তির বার্তাবহ হয়ে স্মরণীয় হতে পারে যদি তা মানবমনে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে। মানুষ মনের অজান্তেই সহজীকরণের পথে ধাবিত হতে চায় কিংবা তা অনুসন্ধান করে। কখনও ব্রিটিশ, কখনও ব্রিটিশ-ভারত এভাবে হাতবদল হতে হতে পরিশেষে পাকিস্তানের হাতের পুতুল হতে হলো আমাদের। বাংলার মানুষের জন্য কেউ ভাবেনি তা কিন্তু নয়; তবে সে চিন্তন পরিপূর্ণতালাভ করেনি, কারণ ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো মত-পথ-চিন্তা প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারে না কিংবা বিকশিত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার সর্বজনগ্রাহ্যতা এবং মানবহিতৈষী তরঙ্গ সর্বসাধারণের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। সহজ করে বললে যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি সাধারণ সূত্র কিংবা সমীকরণের অবতারণা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত যতবড় বিজ্ঞ-ব্যক্তিত্বই আসুক না কেন মুক্তির বার্তা অথবা স্বাধীনতার বাতাবরণ তৈরি করা সম্ভব নয়।

প্রকৃতপক্ষে মানবমনের গহিনে গিয়ে হৃদয়গ্রাহী নির্দেশনার মাধ্যমে আলোকবর্তিকা আনতে না পারলে সাধারণের মণিকোঠায় ঠাঁই মিলে না। হাজার হাজার বছরের পুঞ্জীভূত ব্যথা-বেদনায় যখন এ জনপদের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, তখন তারা উদগ্রীব হয়ে ছুটে চলেছে আলোকপ্রভার খোঁজে- এমনি এক সন্ধিক্ষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণপ্রদীপ হয়ে বিশ্ব মানচিত্রে চিরভাস্বর উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় আলোকপ্রভা বিকিরণ করলেন। তিনি তার আজীবন লালিত স্বপ্ন, দুঃখী নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আরও কঠিন হলেন। এ লক্ষ্যভেদে তাকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর কষ্ট করতে হয়, জীবনের মূল্যবান সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে। মানবপ্রেমী বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের তিক্ষষ্ট মনোভাব অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় হয়েছে। তিনি লিখেছেন, 'যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাই- এ বিশ্বাস আমার ছিল।'

ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত বাঙালির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ভিত্তি দাঁড় করানোর কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলেন। ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রদ্বয় যে মূলে সৃষ্টি হয়, তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল সে বিষয়টি ঘটনাপ্রবাহ দেখলেই বোধগম্য হয়। বাঙালির ওপর অনলপ্রবাহের ধারা বয়ে আনে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এদেশীয় দোসররা। খড়গাঘাত নামতে শুরু হয়- ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার ওপর আঘাত বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে তাদের স্বকীয়তা, পরম্পরা ও মৌলিকত্ব ধ্বংসের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ করেন। তার পরিকল্পনা, সক্রিয় অংশগ্রহণ মাতৃভাষার লড়াইয়ে বাঙালিরা সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। কাজে কাজেই বঙ্গবন্ধুও স্থিরতার ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে ৬ দফা দিলেন- যা প্রকৃতপক্ষে এক দফা কিংবা স্বাধীনতার নামান্তর।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালির একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ও বাঙালির মনের আকাশে মেঘমালার রাজ্যে বিদ্যুতের ঝলকানিতে সৃষ্ট একটু আলোর আভাস মনে হলেও বাঙালির জন্য তা আর স্বস্তিদায়ক অনুভূতি এনে দিতে পারেনি। কারণ তৎকালীন সামরিক শাসক এ বিজয়কে পাকিস্তানিদের পরাজয়সম ভেবে নেয়। ফলে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা হস্তান্তর যেখানে অবধারিত, সেখানে উল্টোপথে কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাঙালিকে নিষ্পেষিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এর প্রতিবাদে বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদ করেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। শুরু হয় বাঙালির ওপর দমন-নিপীড়ন, গুলিবর্ষণ। এই দমন-নিপীড়ন পরোয়া না করে বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তোলে। বাঙালির রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হতে থাকে।

ঘটনার পরম্পরায় ৭ মার্চ বাঙালির আলোর দিশারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো লাখো জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আর মুক্তির বার্তাবহ এ আবেদনের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহজ সূত্রের অবতারণা করলেন। যে সূত্র সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে এক সুতোয় গেঁথে উদ্বুদ্ধ করে শামিল করল মুক্তিযুদ্ধে। যার সমাপ্তি ঘটে, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' উচ্চারণের মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বপন।

বস্তুতপক্ষে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ (২৫ মার্চ মধ্যরাতে) বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই তিনি সব বাঙালিকে উজ্জীবিত করেন- তার ৭ মার্চের গগনবিদারী বজ্রকণ্ঠের পরিপূর্ণ নির্দেশনামূলক মুক্তিসংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে। এই মহামূল্যবান সম্পদ আজ প্রতিটি বাঙালির অহংকার। নিবেদিতপ্রাণ নেতা সঠিক দিকনির্দেশনার দ্বারা মানুষকে একত্র করার মাধ্যমেই কেবল এমন মর্মস্পশী অর্জন তার সাফল্যের খাতায় যুক্ত করতে পারেন।

প্রাণসংশয়ময় পরিস্থিতিতে যখন আকাশে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের কড়া নজরদারি, তখন স্থির মস্তিস্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশনামূলক দুঃসাহসিক ভাষণ তাও আবার শাসক পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিদ্রোহের প্রকাশ বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারও পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষের মণিকোঠা স্পর্শ করার মতো কঠিন কাজ খুব কম মানুষই করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু তার সম্মোহনী শক্তি দিয়ে সহজেই মানুষকে সংগঠিত করে দেশবাসীকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তাই কবিগুরুর উক্তির মতো বাঙালির স্বাধীনতার অর্জনও তার অনেক সাধনার ফল। যে সাধনায় গোটা বাঙালি সব ভেদাভেদ ভুলে সংগঠিত হলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, সমস্বরে তার নির্দেশনাগুলোকে সহজ সুরের জ্ঞানে পালন করল অক্ষরে অক্ষরে। তিনি বাঙালিকে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া জাতীয় সংগীত উপহার দিলেন। বঙ্গবন্ধুর মহামূল্যবান ১৮ মিনিটের অনবদ্য কালজয়ী এই ভাষণ বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে আজ বিশ্বসভায় অগ্রগণ্য স্থান অর্জন করেছে- দীর্ঘ ৪৬ বছর পর 'বিশ্ব-ঐতিহ্য দলিল' হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, ইউনেস্কো অনুমোদন দিয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি হিসেবে। স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বপনক্ষণ ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞাময় দিকনির্দেশনাপূর্ণ তেজদীপ্ত এই ভাষণের আবেদন ও অসম্ভব ভাবাবেগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রতিটি বাঙালির মননে বাঙালির অস্মিতা হয়ে জাগ্রত থাকুক।





মন্তব্য করুন