পুলিশের সামনে হাতজোড় করে বসে আছে এক ছাত্র। তার আশপাশে দাঁড়িয়ে আছে বিমর্ষ ছাত্রছাত্রীরা। তাদের ডান হাত উঁচিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে কিছু বলছেন এক পুলিশ সদস্য। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খোলা ও ক্লাস-পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলনের একটি ছবি। দেশের একটি খ্যাতিমান দৈনিক পত্রিকার অনলাইনে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। করোনার পরিস্থিতিতে গত ১১ মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের দুশ্চিন্তা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে এটা সহজে অনুমান করা যায় এই ছবির মাধ্যমে।

ছাত্র-ছাত্রীরা রাজপথে নেমে এসেছে তাদের পরীক্ষা ও পড়ালেখার দাবি নিয়ে, বিতর্কিত কোনো দাবি নিয়ে আসেনি তারা। আমাদের সন্তানরা পরীক্ষা দিতে চায়। তারা তাদের চলমান পরীক্ষা অব্যাহত রাখতে চায়। তারা সেশনজটে আর পড়তে চায় না। এই পরিস্থিতিতে কী হলো যে, চলমান পরীক্ষাসহ সব কিছু কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে হবে? বিষয়টা আমি বলছি পরিস্থিতিটা তাদের বোঝানো গেলে তো কোনো সমস্যা হতো না। আর বোঝাতে হলে স্নাতক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করতে হবে।

সাড়ে ১১ মাস ধরে স্তব্ধ থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আবার মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে, পড়ালেখা ও পরীক্ষামুখী হতে শুরু করে। তার মধ্যে হঠাৎ ঘোষণা এলো মে মাসের শেষ দিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সূর্য উঠেই যেন কালো মেঘে ঢেকে গেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সেক্টরের সবাই নিরাপদে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঝুঁকি সত্ত্বেও তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনের কার্যক্রম তথা পড়ালেখা বন্ধ হয়ে আছে, পরীক্ষা কোথাও কোথাও চলমান হয়েছিল কিন্তু একটি ঘোষণায় সব স্থগিত হয়ে গেল।

ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আনুষঙ্গিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা অন্যান্য সেক্টরের মতো যদি ভাবতেন, তাহলে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধিসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা পুনরায় চালুর ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা নিতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনকে সুরক্ষা দেওয়ার অর্থ শুধু করোনা থেকে নিরাপত্তা দিতে তাদেরকে নিষ্ক্রিয়ভাবে ঘরবন্দি করে রাখা নয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও দেখা দরকার।

করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্ররা আর ঘরে থাকতে চায় না। তাদের ঘরে আরও দীর্ঘদিন রাখতে হলে একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিশেষ করে স্নাতক পর্যায়ের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হল, ক্লাস বন্ধ থাকুক এ ব্যাপারে একেবারে সম্মত নয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তারা মনে করে, এখন স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা নীতি পালন করে ফিরে আসতে পারে শিক্ষাঙ্গনে।

পরীক্ষা চালু রাখার দাবিতে আন্দোলনের পরিস্থিতিতে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সন্তানদের চাহিদা ও মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছি বা করে থাকি? আমাদের মধ্যে দূরত্ব গড়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা যেহেতু চলমান পরীক্ষা স্থগিত করেন, বিদ্যালয় খোলা-বন্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, সেজন্য তাদের ছাত্রদের চাহিদা ও মনের অবস্থা বোঝা দরকার। বিদ্যমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। নীতিনির্ধারক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বোঝাপড়ার শূন্যতা দূর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মঙ্গলজনক হবে।





মন্তব্য করুন