আধুনিক বিশ্বে যে অনুপ্রবেশ ঘিরে শোরগোল, তার পেছনে সব থেকে বড় কারণ হলো রাজনীতিকদের একাংশের স্বার্থান্ধতা। পশ্চিম থেকে শক, হুনেরা ভারতে এসেছিল একদিন। তারা এমনভাবে এদেশের সঙ্গে মিশে গেছে যে, তাদের আর এখন আলাদা করে চেনা যায় না। যে অহমদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকরা এখন অস্ত্রে শান দিচ্ছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই অসম বিধানসভার নির্বাচন। এই অহমরাও পুব দেশ থেকে এসে ভারতের জল-মাটি-আগুনের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তাদের এখন আর আলাদা করে পুব দেশের মানুষ হিসেবে চেনার কোনো উপায় এবং কারণ নেই।

মার্কিন মুলুকে মেপিকোতে এমন অনুপ্রবেশ কার্যত জলভাত। পুয়ের্তোরিকো থেকেও আমেরিকাতে মানুষের নিরন্তর স্রোত আসছেই। ক্রোয়েশিয়া থেকে মানুষের স্রোত আসছে জার্মানিতে। বসনিয়া থেকেও জার্মানিতে অনুপ্রবেশ একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। সার্বিয়া থেকে যাচ্ছে জার্মানিতে। যাচ্ছে তুরস্ক থেকে, পোল্যান্ড থেকে। আলজেরিয়ার জনস্রোত আসছে ফরাসি দেশে। এই দেশগুলোতে যে অনুপ্রবেশ ঘটছে, সেখানে কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক ঘিরে সেসব দেশের রাজনীতিতে শোরগোল প্রায় নেই বললেই চলে। শোরগোল কেবল বাংলাদেশ থেকে আসা দু-চারজন মুসলমানকে ঘিরে।

গত এক দশকে ভারতের রাজনীতি এতটাই কুটিল আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে যে, এই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের বিষয়টি, যেটি কেবল পশ্চিমবঙ্গ এবং আংশিক ত্রিপুরা আর আসামের সমস্যা ছিল, সেটিকে একটি সর্বভারতীয় আঙ্গিক দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জোরদার করে, বিভাজনের ডিমে তা দেওয়া হচ্ছে। সেই বিভাজনের রাজনীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে ইতিহাসকেও চরমভাবে বিকৃত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি চরম আত্মত্যাগকে কেবল হিন্দুর আত্মত্যাগ হিসেবে দেখিয়ে সন্দর্ভ রচিত হচ্ছে। নামজাদা খবরের কাগজে সেসব আজগুবি তত্ত্ব প্রকাশিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশে সেখানকার সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীদের খেপিয়ে তোলা হচ্ছে সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পর্কে। আর সেই খেপানোর ফসল ঘরে তুলছে ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক শক্তি বিজেপি।

ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে বাংলাদেশ থেকে যে একজন-দুজন মানুষ কেবল পেটর দায়ে আসছেন, যারা জন্মসূত্রে মুসলমান, তারা পরিগণিত হন 'অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে। আর একটা বড় অংশের হিন্দু, মূলত নিম্নবর্গীয় হিন্দু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে থেকে, ধীরে ধীরে তাদের যাবতীয় অর্থবিত্ত ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে চালান করে, এখানে শাসকের অনুগ্রহে রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড করে, জমি, বাড়ি কিনে একটা বিকল্প বাসস্থান করে, সেখানকার সংখ্যাগুরু মানুষদেরই ঠকিয়ে, হঠাৎ একদিন এপার বাংলায় পাড়ি দিচ্ছে, তারা কিন্তু আরএসএস-বিজেপির কাছে শরণার্থী। তারা বাংলাদেশে, সেখানকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলছে, আবার কলকাতায় এলেই বাংলাদেশে মুসলমানদের 'অত্যাচারে'র, বিশেষ করে মানুষ যা সব থেকে বেশি খায়, হিন্দু নারী মুসলমানের হাতে ধর্ষিতা হচ্ছে, এমন আজগুবি রোমহর্ষক কথা প্রচার করে আরএসএস, বিজেপির পালে বাতাস জোগাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে ভারতের ভোটার কার্ড জোগাড় করে, হাওড়াতে ফ্ল্যাট কেনা সিলেটের শ্রীমঙ্গলের ছেলেটির যাবতীয় কীর্তি কিন্তু গত দশ বছরে, তৃণমূলের আমলেই পল্লবিত হয়েছে।

এই অনুপ্রবেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জলঘোলা করতে যেমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকরা সক্রিয়, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র বলে যারা নিজেদের দাবি করেন, চলতি কথায় যাদের 'ঘটি' বলা হয়, তাদের একটা বড় অংশও নিজেদের স্বার্থহানির আশঙ্কায় দেশভাগের অনেককাল আগে থেকেই 'বাঙাল' বিদ্বেষকে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন, যা আজ ভারত, বাংলাদেশ- এই দুই দেশেরই সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু সাল্ফপ্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরকে অনেকখানিই হূষ্টপুষ্ট হতে সাহায্য করেছে। নয়ের দশকের গোড়ার দিকে অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার কথা বলে খবরের কাগজে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়।

এই অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে সাম্প্রদায়িক শিবির মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শুধু বিকৃত করছে না, সেই সঙ্গে পাকিস্তানের হানাদারদের এক ধরনের ইতিবাচকভাবে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে চাইছে। বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন মুসলিম জাতীয়তার কফিনে পেরেক পোতার কাজটি শুরু করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিজয় কেতন ওড়াবার ভেতর দিয়ে। সেই পর্বটি ধারাবাহিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণতা পায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত অধিকারে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির ভেতর দিয়ে। সাম্প্রদায়িকতার বিষে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে হিন্দু-মুসলমানে বিভাজিত করার বহু চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

'৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বিজয়ের রজতজয়ন্তী। সরকারি অনুষ্ঠান হচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা করছেন। মঞ্চে অন্নদাশঙ্কর, পিএন দার সাইমন ড্রিং, শান্তিময় রায়, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের সঙ্গে বিদেশি অতিথি হিসেবে নিবন্ধকার ছিলেন। আমার ঠিক পাশেই বসেছিলেন তরুণ এক ব্যক্তি। মুজিব কোট পরিহিত। তিনি আমাকে না চিনলেও বুঝছেন বিদেশি অতিথি। মুক্তিযুদ্ধে বেছে বেছে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করেছে পাক হানাদাররা, বেছে বেছে হিন্দু রমণী ধর্ষণ করেছে তারা- এ ধরনের তত্ত্বের যারা উপস্থাপনা করেন। যারা এগুলো লিখছেন, তারা প্রকৃত তথ্য জানেন না, এমনটা ধরে নেওয়ার কিন্তু কোনো কারণ নেই।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর অন্নদাশঙ্করকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মেঘনাদ সাহার ছাত্র মুরলি মনোহর যোশি। পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। তিনি কি করে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে শরিক হলেন? অন্নদাশঙ্কর বলেছিলেন, শিক্ষিত তুমি কাকে বলবে? ডিগ্রি থাকলেই কি শিক্ষা হয়? অন্তরের শিক্ষাই হলো প্রকৃত শিক্ষা। অনুপ্রবেশ আর হানাদার পাকবাহিনী কর্তৃক বেছে বেছে হিন্দু নারী ধর্ষণের তত্ত্বের উদ্গাতা এবং সেই তত্ত্বের প্রচারকদের উদ্দেশে অন্নদাশঙ্করের কথাটাই খুব বেশি করে বলতে ইচ্ছে করছে। সেই উচ্চনাদে এই কথাটিও যোগ করতে চাই, এসব কথা যারা বলছেন কিংবা লিখছেন এবং অবশ্যই যারা এসব প্রকাশ করছেন, তারা কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের সুস্থিতিই নষ্ট করতে চাইছেন, তা ভাববার মতো কোনো কারণ নেই। তারা চাইছেন বাংলাদেশেরও সুস্থিতি চুরমার করতে। তাহলে তাদের পক্ষে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সুস্থিতি নষ্ট করার কাজটা খুব সহজ হবে। আর সেটি নষ্ট করতে পারলে সব থেকে বেশি পোয়াবারো মার্কিন প্রভুদের।





মন্তব্য করুন