বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ইউরোপ থেকে শুরু হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো বলগ্না বিশ্ববিদ্যালয় ইতালির উত্তর অংশে ১০৮৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৩২টি বিভাগ, ১১টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে এবং শিক্ষার্থী ৮৭ হাজার ৫৯০ জন ও শিক্ষক দুই হাজার ৮৪২ জন। অপফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঠিক তারিখ না থাকলেও ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে শিক্ষা প্রদান শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী ২৪ হাজার ২৯৯ জন এবং শিক্ষক এক হাজার ৬০৪ জন। অপফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্য থেকে ২৮ জন প্রধানমন্ত্রী ও ৫৫ জন নোবেল বিজয়ী রয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পণ্ডিত ১২০৯ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাজ্যে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুভসূচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ২৩ হাজার ৩৯০ জন এবং শিক্ষকসহ মোট স্টাফ ১১ হাজার ৫২৮ জন। কেমব্রিজের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৭ জন রাষ্ট্রপ্রধান ও ১১০ জন নোবেল বিজয়ী রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজিত জ্ঞান উন্নয়নকে যে ত্বরান্বিত করে, তা ইউরোপের দিকে তাকালে সহজেই অনুমেয়।

ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্বাহী সংস্থার পরামর্শক্রমে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয়, তামিলনাড়ুতে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহারাষ্ট্রে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পশ্চিম বাংলার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রয়েছে পূর্ব বাংলার নানা যোগসূত্র। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি অনুষদের অধীনে ৬২টি বিভাগ, ১৯টি শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র, দুটি ইনস্টিটিউট ও একটি তথ্যপ্রযুক্তি স্কুল রয়েছে এবং শিক্ষার্থী ২২ হাজার ৫২০ জন ও শিক্ষক ৭৩১ জন। অসংখ্য খ্যাতনামা সাবেক শিক্ষার্থীর মধ্যে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দার্শনিক নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ), কবি কামিনী রায়, ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, শিশু ছড়াকার সুকুমার রায়, পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ও কবি জীবনানন্দ দাশ অন্যতম। স্যার সৈয়দ আহমেদ খান কর্তৃক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১২টি অনুষদ, ৯৮টি বিভাগ, ১৫টি কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট ও তিনটি একাডেমি রয়েছে এবং শিক্ষক এক হাজার ৩৪২ ও শিক্ষার্থী ২৭ হাজার ৩২৩ জন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমিন হিলমি দিদি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, মনসুর আলী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান ভোপাল রাজ্যের শাসক এবং ড. জাকির হুসেইন ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

১৯ আগস্ট ১৯১১ কার্জন হলে পূর্ববঙ্গের ছোট লাট ল্যান্সলট হেয়ার-এর বিদায় এবং বেইলি-এর স্বাগত অনুষ্ঠানে নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এলে ৩১ জানুয়ারি ১৯১২ সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পুনর্দাবি করেন। ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ৮৭৭ শিক্ষার্থী, ৬০ জন শিক্ষক এবং তিনটি অনুষদের অধীনে ১২টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী ৩৭ হাজার ১৮ জন, শিক্ষক এক হাজার ৯৯২ জন, ১৩টি অনুষদের অধীনে ৮৩টি বিভাগ, ইনস্টিটিউট ১২টি এবং ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র ৫৬টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়, মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনে যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে, তা অনবদ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইন-প্রশাসন ও রাজনীতি-ইতিহাসসহ সর্বক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অবদান রাখছেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ১০ জন, প্রধানমন্ত্রী সাতজন এবং নোবেল বিজয়ী একজন রয়েছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিরকাল গৌরবান্বিত বোধ করবে।

ইউরোপ ও ভারত উপমহাদেশের পুরোনো ও প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায়তনিক কাঠামোগত তথ্য পর্যালোচনান্তে দেখা যায়, শত বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ অবস্থানে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি, শিল্প ও বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধনের জন্য যেরূপ মৌলিক বা প্রায়োগিক তত্ত্ব ও প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেরূপ সৃজিত জ্ঞানের পূর্ণতার জন্য এখন থেকেই নানা পরিকল্পনা নেওয়া আবশ্যিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জৈবপ্রযুক্তি সংমিশ্রিত হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে সামাজিক জীবনমান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে এবং অদূরে যে পঞ্চম শিল্পবিপ্লব শুরু হবে, তার সঙ্গে অভিযোজিত হতে ও নেতৃত্ব দিতে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তি অভিযোজনের পাশাপাশি নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে জ্ঞান সৃজনের রূপকল্প গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি এবং মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে শিক্ষার গুণগত মান ও পরিবেশ উন্নয়ন এবং গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনটি ধাপে ১৫ বছরের 'ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাস্টার প্লান' প্রণয়ন এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার আধুনিকায়নের জন্য যে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চয়ই ভালো উদ্যোগ। ১৪ জুন ২০২০ সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান গ্রহণ করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োচিত। স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতাসহ নানা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক কার্যাবলিকে কীভাবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ রূপায়ণ ও ভিশন-২০৪১-এর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা যায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা হিসেবে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রতিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিরোধসহ বিবিধ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিশতবর্ষে দেশ ও জাতি গঠনে সরকারের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০, ভিশন-২০৪১ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ রূপায়ণে কীভাবে সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা যায়, তার প্রয়োগযোগ্য রূপরেখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২১২১ রূপকল্প ঘোষণা করা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২১২১ রূপকল্পে পাঁচ বছরের মধ্যমেয়াদি ও ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে। ২০৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের শতবর্ষে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধবর্ষে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২১২১ রূপকল্প পুনর্মূল্যায়নেরও সুযোগ থাকবে। একটি সময়োপযোগী বৈজ্ঞানিক প্রক্ষেপণ নির্ণয় করা গেলে ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে যেসব দুর্বলতা পরিলক্ষিত হবে, তা ২১২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিশতবর্ষে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত সব অভিজ্ঞতা রূপকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নে কার্যকরভাবে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে মর্মে প্রত্যাশা করছি।



মন্তব্য করুন