বহু বছর আগের ঘটনা, গিয়েছিলাম একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে দেখলাম। বহুদিন পর ছোটবেলার শিক্ষককে দেখে তার কাছে ছুটে গিয়ে বললাম, স্যার, আপনি কি আমায় চিনতে পেরেছেন? শিক্ষক বললেন, না বাবা, দুঃখিত, আমি তোমায় ঠিক চিনতে পারছি না। আমি বললাম, স্যার, আমি আপনার ছাত্র, আপনার মনে থাকার কথা, ক্লাস ফোরে পড়ার সময় আমাদের এক সহপাঠীকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। সেখানে লিখেছিলাম আমি তাকে ভালোবাসি। সেই সহপাঠী কাঁদতে কাঁদতে আপনাকে নালিশ করেছিল। আর আপনি সব ছাত্রছাত্রী একত্রিত করেছিলেন।

প্রথমে শুরু করলেন চিঠি কীভাবে, কাকে এবং কেন লেখে। তারপর বর্ণনা দিলেন ভালোবাসা কী, তাকে কি দেখা যায়, ছোঁয়া যায় নাকি অনুভবের বিষয় ইত্যাদি। তারপর একজন একজন করে উদাহরণ দিতে বললেন, ভালোবাসা বলতে কী বোঝায়। যেখানে আমি বসেছি আমার বলার সময় হবে সবার শেষে। আমি ভয়ে কাঁপতে শুরু করি। কারণ, চিঠি তো আমি লিখেছি! ঘটনা তো ঘটে যাবে আজ।

আমি যে কাজটি করেছি তা জানাজানি হওয়ার পর আমি লজ্জার মুখোমুখি হবো, শিক্ষকরা আমার সম্পর্কে বাজে ধারণা পাবেন, স্কুলে সবাই আমাকে নিয়ে টিটকারি দেবে এবং শেষে নালিশ যাবে আমার মা-বাবার কাছে। কী প্রতিক্রিয়া হবে, এসব ভাবতে ভাবতে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছিল তখন।

এরপর যখন আমার পালা এলো, আপনি হঠাৎ আমাকে বললেন এই পান্নু এক গ্লাস পানি নিয়ে আয় আমার জন্য। আমি শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হবো সে শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আপনি আবারও বললেন কিরে পানি আনতে বললাম না তোকে? আমি পানি এনে আপনাকে দিলাম, আপনি পানি পান করেই ক্লাস শেষ করে দিলেন। আমাকে কিছুই বললেন না।

এতে করে আমার মনের মধ্যে ভয় আরও বেড়ে গেল। কারণ আমার মনে হচ্ছিল পরের দিন আপনি সবার সামনে আমাকে ডাকবেন এবং ঘটনাটি তুলে ধরবেন। না, আপনি তা না করে সবাইকে বললেন, আগামীকাল তোমরা একে অপরকে একটি চিঠি লিখবে- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি' এবং আমার কাছে জমা দিবে। পরের দিন সবাই চিঠি লিখে আপনাকে দিয়েছিলাম। আপনি আমার চিঠি, যা আমি সহপাঠীকে লিখেছি, সেটা পকেট থেকে বের করে সবাইকে পড়ে শুনালেন।

চিঠিখানা যে আমি লিখেছি আপনি তা কখনও কাউকে বললেন না। আমাকেও কিছু বললেন না! স্যার, আপনি সেদিন আমার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। এই ঘটনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, জীবনে আর কখনও কাউকে চিঠি লিখব না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারিনি। আরও চিঠি লিখেছি তবে উত্তর কখনও আসেনি, বারবারই ভুল জায়গায় গিয়ে ধরা খেয়েছি। স্যার, ঘটনাটা কি মনে পড়ছে এখন? আপনার এটা ভোলার কথা না!

স্যার জবাব দিলেন, হ্যাঁ ঘটনাটা খুব ভালোভাবেই মনে আছে আমার। তুই সেদিন চিঠি না লিখলে হয়তো বিষয়টি সুন্দর করে তোদের সবাইকে বোঝাতে পারতাম না, চিঠি এবং তার গুরুত্ব কী ইত্যাদি। এ ছাড়া ছোটবেলায় আমিও তোর মতো একটি মেয়েকে চিঠি লিখেছিলাম। ঘটনাটি জানাজানি হয়েছিল। এত লজ্জা আর কষ্ট পেয়েছিলামম যখন আমার স্যার সবার সামনে আমাকে অপমান করেছিলেন। সেই থেকে জীবনে প্রতিজ্ঞা করি, প্রেম বা বিয়ে জীবনে করব না। তাই জীবনটা একাই কাটিয়ে দিলাম। তবে শুনে খুশি হলাম যে, তুই চিঠি লেখা বন্ধ করিসনি। যখন আমি সবার চিঠি চেক করছিলাম তখন আমি ইচ্ছা করেই তোর চিঠিটা সবাইকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। আমার গুরুজন যে ভুল করেছিলেন যদি সেটা আমি করতাম, তাহলে কি তুই আমাকে আজ চিনতি? কী মনে হয় তোর?

গুরুজন মারা গেছেন। তার সুশিক্ষা হৃদয়ে রয়ে গেছে। স্যারকে স্মরণ করতে মনে পড়ে গেল সেদিনের সেই ঘটনাটি।






মন্তব্য করুন