ক'দিন ধরেই যেন মনে হচ্ছে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় একমুঠো সাদা মেঘ আর কিছু মিষ্টি স্বপ্নের অনুভূতি নিয়ে হাজির হলো এবারের নতুন বছর। মনে হচ্ছে, মনের আঙিনায় এতদিনে নেতিয়ে যাওয়া সবুজ ঘাসগুলো যেন একটু একটু করে সতেজ হয়ে উঠছে। আর এমন সতেজ অনুভূতির তুলিতে আঁচড় কেটে যেন নানাজন বুনে চলেছেন নানান স্বপ্ন। আমিও যেন অনেকের মতো করে কাগজের পাতায় পাতায় লেপ্টে থাকা এসব স্বপ্নের ওপর চোখ বুলাতে বুলাতে কী যেন একটা টের পেলাম। মনে হলো, নিজের ভেতরে বরফের মতো জমাট বাঁধা কিছু একটা যেন একটু একটু করে গলে পড়ছে। একটু ধম নিতেই খটকা লাগে- এ কি স্বপ্ন নাকি অন্য কিছু? একটু ভাবলাম। না, ওই রকম কিছু নয়। মনে হলো কোথাও যেন একটা যোগ-বিয়োগের হিসাব মেলানোর কাজ করে চলেছি অবিরাম। যার অনেকটাই অনেকের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে ঠিকঠাক। শুধু দু-এক স্থলে একটু-আধটু কেমন যেন থেকে যাচ্ছে, এই যা। সেই একটু-আধটুই আজ মিলিয়ে নিতে বসে গেছি অনেকের সঙ্গে।

এক.
আমরা যারা প্রবাসে থাকি তারা ঠিকই টের পাই ফেলে আসা ধূসর স্মৃতিগুলো কেমন করে ভেতরটায় কতটা শূন্যতা তৈরি করে। প্রায়ই সে শূন্যতায় মুষড়ে পড়ি। তখন মন ভালো করার জন্য নাটক দেখি, সিনেমা দেখি। তবু কোথাও একটু শূন্যতা থেকেই যায়। তখন ফিরি খুব প্রিয় মানুষ আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদ স্যারের কাছে। স্যারের কথা শুনলে মনটা শীতল হয়ে আসে। ক'দিন আগে ইউটিউবে দেখছিলাম স্যার একটা অনুষ্ঠানে নেতা ও নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন। বলতে গিয়ে স্যার একটা গল্প বলেন। গল্পটা আজকের শক্তিশালী চীনকে নিয়ে। আমরা কি জানি আজকের যে আধুনিক চীন তার পেছনে কোন মানুষটির বিশেষ অবদান রয়েছে? মাও সেতুং। মাও সেতুং যখন কোনো প্রস্তাব তুলতেন তখন তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলতেন, আপনারা কি এতে রাজি? সবাই বলতেন জ্বি হুজুর। যখন সবাই একটু শান্ত হতো তখন পেছন থেকে এতটুকু বেটে একজন মানুষ একখান হাত তুলে ধরতেন। মাও সেতুং তখন মিটিমিটি হেসে বলতেন দ্যাং, তুমি এখনও আমার বিরুদ্ধে। সেই দ্যাং-ই কিন্তু পরবর্তীতে আধুনিক চীনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সমৃদ্ধ করেছিলেন। সেই মানুষই তো নেতৃত্ব দিতে পারেন যিনি তার মতের কিংবা আদর্শের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছুর বিপরীতে দাঁড়াতে পারেন। ভাবি, আজ আমরা কত আধুনিক। অথচ কতটা ব্যক্তিত্বহীন, কতটা নেতৃত্বহীন।

স্যারের কথাগুলো শুনতে শুনতে কেমন করে যেন নিজের ভেতরে আজকের সমাজের একটা হাল-চিত্র ভেসে ওঠে। দেখি নেতার পেছন পেছন কেমন করে কর্মীরা নিজেদের অস্তিত্বকে বিকিয়ে দিচ্ছে। অথচ একটা সময় এমন তো ছিল না। অতীতের দিকে তাকালে আমরা সেটা দেখতে পাই। একবার বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিটিং করছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন বাইশ কি তেইশ। শহীদ সাহেবের মতের সঙ্গে তখনকার তরুণ শেখ মুজিব দ্বিমত পোষণ করেন। তাতে শহীদ সাহেব খানিকটা রেগে গিয়ে বলেন, হো আর উই টু গিভ দ্য ডিসিশন ফর পার্টি? কথাটা যেন খানিকটা বঙ্গবন্ধুর গায়ে লাগে। তিনি তখন সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, ইউ উইল সি হো এম আই। তারপরে বঙ্গবন্ধু মিটিং থেকে বের হয়ে গেলেন। শহীদ সাহেব তখন লোক পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। আহা, আজও যখন ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেপ্টে থাকা এমন ঘটনাগুলো মানসপটে ভেসে ওঠে, তখন কেমন করে যেন ভেতরটা চেপে আসে। ভাবি, কেমন করে আজকের সমাজ থেকে নির্বাসনে চলে গেল সেই নেতা ও কর্মী, সেই নেতৃত্ব ও আদর্শ।

দুই.

প্রতিটি নতুন বছর আমাদের নতুন করে ভাবায়। আর সেই ভাবনাগুলোর জন্মই হয় কোনো না কোনো বেদনা থেকে, দুঃখ থেকে। বছর দশেক আগেও মনটা যখন পাপ বোধে চেপে আসত, তখন ওয়াজ শুনতাম। এতে শান্তি আসত মনে। আজও সেই পাপ বোধে চেপে আসে মন। কিন্তু সেই আগের মতো করে নির্জলা ওয়াজ আজ আর খুঁজে পাব কোথায়? আজকাল ওয়াজের নামে যেসব সামনে আসে তা যেন সংকীর্ণতা আর সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। ক'দিন আগে এক হুজুরের কথা শুনছিলাম। তিনি বলছেন, একজন শিল্পী যদি লাখ লাখ টাকা নিতে পারেন, তাহলে তিনি কেন পারবেন না? একজন শিল্পী যদি হেলিকপ্টারে কনসার্টে যেতে পারেন, তাহলে তিনি কেন হেলিকপ্টারে ওয়াজ মাহফিলে যেতে পারবেন না? নিশ্চয়, তিনি পারবেন। বিষয়টা আসলে সেখানে না, বিষয়টা হচ্ছে আদর্শে। একজন শিল্পী বাইরে গিয়ে মদ্যপানে মগ্ন হলে একজন হুজুরও কি সেভাবে মগ্ন হতে পারবেন? কেমন করে আমাদের সেই মধ্যবিত্ত আটপৌর জীবন যাপনের আদর্শের ধর্মগুরুরা আজ এতটা ভোগাসক্ত জীবনে মগ্ন হয়ে পড়লেন?

আজকাল ধর্ম প্রচারে যে শুধু ভোগবাদই প্রকাশ পেয়েছে তা কিন্তু নয়, পারস্পরিক বিদ্বেষও খানিকটা প্রকট হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগে একটা ভিডিও ক্লিপ সামনে আসে। দেখলাম একজন তরণ জনপ্রিয় হুজুর দেশের একজন গুণী বুদ্ধিজীবীকে বলছেন, 'আমি তো ওই বুদ্ধিজীবীকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী উপাধি দিয়েছি।' কথাটা বলে তিনি তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন। খুব আহত হলাম এমনটা দেখে। মানলাম কোনো এক টকশোতে তিনি ওই বুদ্ধিজীবীকে যুক্তিতে, তর্কে হারিয়েছেন। তাই বলে কি একজন মানুষ হিসেবে যে সম্মান তার কাছে আমানতস্বরূপ ছিল, সেটাকে তিনি এতটা হেসে-খেলে খেয়ানত করতে পারলেন। এতে করে তিনি কী আদর্শ, কী ধর্ম শেখালেন? আজকাল এসব দেখে দেখে ভাবনা হয় খুব। ভাবি, এই যে এত টাকা খরচ করে এত ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে তবু কেন ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে এত খুন, এত ধর্ষণ, এত লুটপাটে ছেয়ে গেছে?

তাই তো নতুন বছরের এমন দিনে বন্দনা করি, আমরা যেন এমন শান্তির ধর্মকে নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে নিজেরাই বুঝে নিতে পারি। যেমন করে বুঝে নিই নিজের বাপ-দাদার ভিটামাটি। প্রার্থনা এটাই, অন্যের মুখের সাম্প্রদায়িকতার এমন বিষবাষ্পে আর পুড়বে না কোনো হিন্দু বাড়ি, জ্বলবে না কোনো মানব হৃদয়। আর নজরুলের কথাটাও যেন মনে রাখি সব সময়। 'মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।'

তিন.

এমনি করে যখন একটু আধটু হিসেব মেলাচ্ছিলাম তখনই একটা বিষয় টের পেলাম। মনে হলো ভেতরটা চেপে আসছে খুব। কে যেন দূর থেকে একটা অস্পষ্ট সুরে শোনাচ্ছে- একটু মুরুব্বিয়ানা হয়ে গেল না তো? একটু বোধহয় ঘাবড়েই গেলাম। সেই যে ছোটবেলা থেকে বড়দের কাছ থেকে শুনে আসছি, তা আজও শুনে চলেছি নিজের অগোচরে। একটু ভাবলাম। একটু ফিরে গেলাম পেছনে। দেখি, জার্মান লেখক কাফকা মাত্র ৩২ বছর বয়সে বিশ্বকে দিয়েছেন কালজয়ী উপন্যাস 'রূপান্তর'। কবিগুরু মাত্র ৩৩ বছর বয়সে রচনা করেছেন বিশ্বনন্দিত 'সোনার তরী'। নজরুল মাত্র ২৩ বছর বয়সে আমাদের দিয়েছিলেন 'বিদ্রোহী'। হেন্সবার্গ, সে তো কোয়ান্টাম ফিজিপে মাত্র ৩১ বছর বয়সেই নিয়েছিলেন নোবেল। আহা, এমন আরও কত মানব যে আছেন তার কতটুকুর খবরই বা রাখতে পেরেছি?

তাই তো এমন দিনে এতসব অদৃশ্য ভয় থেকে মুক্তির গান গাইতে চাই। প্রতিজ্ঞা করতে চাই মেনে নেওয়ার এতটুকুন বিনয়কেও যেন দূরে ঠেলে দিয়ে গাইতে পারি- 'মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আরেক হাতে রণ তূর্য।' প্রভু, আর যদি নিতান্তই দুঃখ দিয়ে দাও, তবে যেন শক্তি দিও মনে। যেন গাইতে পারি- 'মনেরে আজ কহ যে, ভাল মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে।'





 



মন্তব্য করুন