আমাদের সমাজের কথিত সুধীজন বলেন, দলের কর্মীদের জন্য নেতারা দায়বদ্ধ। মূলত তারা বলেন, ভক্তের কর্মের জন্য নেতারা শাস্তি পাবেন। এ ধরনের উক্তি সম্পূর্ণ কোরআনবিরোধী। পবিত্র কোরআনুল হাকিমে এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি আয়াত রয়েছে। সুতরাং কোনো অবস্থায় আল কোরআনকে অমান্য করা উচিত হবে না, তাতে পাপাচার হয়ে যাবে। আমরা নিজেদের অজান্তে কোরআনের অসংখ্য আয়াতকে পাশ কাটিয়ে বিধানাবলি রচনা করতে থাকি যা আল্লাহর সঙ্গে বাড়াবাড়ির শামিল। হজরত রাসুলে করিম (স.) এরশাদ করেছেন : 'নিশ্চয় কোরআনের এক আয়াত অন্য আয়াতের ব্যাখ্যা ও তাফসির করে।' অতএব, কোরআনি তাফসিরের পরিপন্থি কোনো তাফসির বর্ণনা করা কারও জন্য জায়েজ নয়।

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, অতএব আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, আপনি তো একজন উপদেশদাতা মাত্র, আপনি তাদের দায়গ্রস্ত কর্ম নিয়ন্ত্রক নন (আল-কোরআন; সুরা গাশিয়া)। কিন্তু যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনার দায়িত্ব তো শুধু পৌঁছে দেওয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা (আল-কোরআন; সুরা আল ইমরান)। তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং সতর্ক হও; কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রেখ, আমার রাসুলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্ট প্রচার করা (আল-কোরআন; সুরা মায়েদাহ)। আর আপনি বিতাড়িত করবেন না তাদের যারা সকালে ও বিকেলে তাদের রবের ইবাদত করে শুধু তারই সন্তুষ্টি কামনা করে। আপনার ওপর তাদের কোনো কর্মেরই জবাবদিহির দায়িত্ব নেই এবং তাদের ওপরও আপনার কোনো কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব নেই, যে কারণে আপনি তাদের বিতাড়িত করবেন। অন্যথায় আপনি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন (আল-কোরআন; সুরা আনআম)। তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসুলের। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আমার রাসুলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া (আল-কোরআন; সুরা তাগাবুন)।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, যার যার আমল তার তার। আমাদের জন্য আমাদের কর্ম (আমল) এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম (আমল)। এই বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কয়েকটি আয়াত রয়েছে। যার যার আমল বা কর্ম তার তার, কারও কর্মের জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, তারা ছিল এক উম্মত যারা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে তা তাদের, আর তোমরা যা কর তা তোমাদের। তারা যা করত সে ব্যাপারে তোমাদের কোনো প্রশ্ন করা হবে না (আল-কোরআন; ২:১৩৪)। আপনি বলুন, তোমরা কি আমাদের সঙ্গে আল্লাহ সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও? অথচ তিনি আমাদের পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। আর আমাদের জন্য আমাদের কর্ম (আমল) এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম (আমল)। আমরা তার জন্য নিবেদিত (আল-কোরআন; ২ :১৩৯)। উক্ত আয়াতের আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যার যার আমল তার তার, উপদেশ দাতারা মধ্য পন্থায় উপদেশ দিতে পারবেন।

কেউ কারও কর্মের জন্য দায়ী নয়, প্রত্যেকে নিজ কর্মের জন্য দায়বদ্ধ। 'প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী' এই বিষয়ে পবিত্র কোরআনে প্রায় অর্ধশত আয়াত রয়েছে, যা থেকে কয়েকটি আয়াত উপস্থাপন করলাম। সুতরাং কোনো অবস্থায় আল-কোরআনের কোনো বিষয়কে অমান্য করা সমীচীন হবে না, কেউ এমনটা করলে কাফের হয়ে যাবে। নিজ কর্ম ব্যতিরেকে অন্যের কর্মের জন্য কেউ দায়ী হবে না, ঠিক তেমনি অনুসারীর কর্মের জন্য নেতা দায়ী হবে না।

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে বলেন, এ কারণে যে, আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী (আল-কোরআন ১৪ :৫১)। স্মরণ কর :সেদিনের কথা যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মসমর্থনে কথা বলবে এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণ ফল দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না (আল-কোরআন ১৬ :১১১)। এটা তোমার কৃতকর্মেরই ফল; কেননা আল্লাহ তো বান্দাদের প্রতি অবিচার করেন না (আল-কোরআন, ২২:১০)। আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেওয়া হবে। আজ কারও প্রতি জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত (আল-কোরআন ৪০:১৭)।

ফিতনা হত্যার চেয়ে মহাপাপ। এই বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা ফিতনা সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশে বলেন : ফিতনা হত্যার চেয়ে মহাপাপ (আল-কোরআন ২ :২১৭)। আর যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদেরই জন্য রয়েছে লানত এবং তাদেরই জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট পরিণাম (আল-কোরআন ১৩:২৫)। আর মানুষকে তাদের প্রাপ্য দ্রব্যাদি কম দিও না এবং পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে ফিরিও না (আল-কোরআন ২৬ :১৮৩)। আর তোমাকে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না। এবং তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয় না। নিশ্চয় আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না (আল-কোরআন ২৮:৭৭)।

পূর্ণ জ্ঞান না থাকায় মানুষ আয়াত প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, এমনকি যখন তারা উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ বলবেন- তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিলে? অথচ এগুলো সম্পর্কে তোমাদের পূর্ণ জ্ঞান ছিল না। অথবা তোমরা অন্য কিছু করছিলে (আল-কোরআন ২৭ :৮৪)? যারা আয়াত প্রত্যাখ্যান করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং আমার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে, তারাই হবে জাহান্নামি, সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে (আল-কোরআন ২ :৩৯)। আর আমি আপনার প্রতি স্পষ্ট আয়াতসমূহ নাজিল করেছি। কাফেররা ছাড়া কেউ তা প্রত্যাখ্যান করে না (আল-কোরআন ২:৯৯)। নিঃসন্দেহে ইসলাম তথা আত্মসমর্পণই হলো আল্লাহর নিকট দ্বীন বা ধর্ম। যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে প্রকৃত জ্ঞান আসার পর শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত তারা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছিল। আর কেউ আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করলে (সে জেনে রাখুক) নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসেব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত (আল-কোরআন ৩ :১৯)। আর যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে, তারাই বাম দিকওয়ালা, হতভাগ্য। তারা হবে অগ্নিপরিবেষ্টিত বন্দি (আল-কোরআন ৯০ :১৯-২০)।

লেখক : চেয়ারম্যান, তাসাউফ ফাউন্ডেশন

মন্তব্য করুন