মূর্তি এবং ভাস্কর্য নিয়ে এখন জোর তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্ক যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা সবার কাছেই পরিস্কার। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব স্থাপনা রাখা উচিত হবে কিনা তা নিয়ে একদল প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি তাদের মদদে কতিপয় দুস্কৃতকারী বঙ্গবন্ধুর অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য ভাঙচুর করে ধরাও পড়েছে। অন্য পক্ষও প্রতিবাদ করছেন, এ ধরনের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে হুংকার দিচ্ছেন এবং আরও ভাস্কর্য নির্মাণের আহ্বান জানাচ্ছেন।

লক্ষণীয় যে, মূর্তি এবং ভাস্কর্য নিয়ে এই আলোচনায় একটি শব্দ 'প্রতিমা' কম উচ্চারিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হয়তো শব্দত্রয়ের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিয়ে বিশাল বিভ্রান্তি রয়েছে। চলমান বিতর্ক সংঘর্ষের দিকে না গিয়ে আলোচনায় থাকলে এসব ধারণা ক্রমশ পরিস্কার হবে। মতামতের ভিন্নতা থাকবেই এবং সেই পার্থক্য বজায় রেখে বিতর্ক যেন আরও গভীরে যায় সেই উদ্দেশ্যে এই লেখা। পার্থক্য ও মিল বুঝতে মূর্তি, প্রতিমা এবং ভাস্কর্য- এই ক্রমানুসারে আলোচনা উত্থাপন করছি।

মানুষ বা কোনো প্রাণীর ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতিকে সাধারণত আমরা মূর্তি বলি। এসব মূর্তি টেবিলের ওপরে রাখা ছোট হাতি থেকে খোলা চত্বরে বেদির ওপরে রাখা বিশাল আকৃতির মাও সে তুঙও হতে পারে। আমার এক বন্ধু কবিগুরুর ছোট আবক্ষমূর্তি পেপার ওয়েট হিসেবে ব্যবহার করে। খেলনা হিসেবে রঙিন বাঘ-সিংহ বা ঘোড়া শিশুদের প্রিয় বস্তু।

ঐতিহাসিক বিখ্যাত ব্যক্তিদের আবক্ষমূর্তি, সক্রেটিস, প্লেটো, জুলিয়াস সিজার- এসব অনেকে সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখেন। মানুষ, কুকুর বা পাখির আকৃতির রোবোটও এক ধরনের মূর্তি, যে সব রোবোট গৃহকর্মে সহায়তা বা হাসপাতালে সেবা করবে বলে তৈরি করা হয়। সেগুলোর চেহারা বা আকৃতি মানুষের মতো হলে আমরা সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সিনেমার মডেল হিসেবে বিশাল ডাইনোসর বা অতিকায় কোনো প্রাণীর মূর্তিও রয়েছে। মূর্তি তৈরিতে যে কোনো উপযুক্ত উপাদান ব্যবহার করা যায়, উদ্দেশ্য প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা। বড় বড় মূর্তি তৈরিতে পাথর, কনক্রিট, লোহা, তামা ইত্যাদি স্থায়ী উপাদান ব্যবহার করা হয়। অনেক দেশে মোমের মূর্তির মিউজিয়াম রয়েছে। লন্ডনের 'মাদাম তুসো' মিউজিয়াম জগৎ বিখ্যাত। সারা দুনিয়ার বিখ্যাত মানুষের মূর্তি রয়েছে সেখানে। একদম অবিকল সেই মানুষটির মতো তবে নিশ্চল। আইনস্টাইনের সঙ্গে যে কেউ ছবি তুলে নিতে পারবে!

মূর্তি হলেই সেটা পূজনীয় নয়, পূজার জন্য চাই 'প্রতিমা' বা ইংরেজিতে বললে 'আইডল'। এর মূলে আছে ভক্তি, যাকে ভক্তি করা, তিনি যদি বাস্তবে সম্মুখে না থাকেন তাহলে তার ছবি বা প্রতিকৃতি স্মৃতিবহ হয়ে দাঁড়ায়। পিতা-মাতার ছবি সংরক্ষণ সবাই করতে চায়। সন্তানের ছোট কালের জামাটি মা সযত্নে গুছিয়ে রাখেন। এই অনুপস্থিতকে স্মরণ করার প্রক্রিয়াটি যখন ব্যক্তিগত পর্যায় ছেড়ে সমাজের কোনো নিয়মের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট হয় তখন আনুষ্ঠানিক পূজা কথাটা এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। তখন শ্রদ্ধার স্থান দখল করতে পারে প্রার্থনা, আর 'প্রতিমা' হয়ে পড়ে বিমূর্ত কোনো আইডিয়ার রূপ, সরাসরি কোনো ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয়। যুগে যুগে মানুষ আকাশ, বাতাস, সূর্য, বিশাল বৃক্ষ, বিভিন্ন প্রাণীকে পূজা করেছে, তাদের প্রতীক তৈরি করে পূজার উপকরণ সাজিয়েছে। শিবলিঙ্গ কোনো প্রাণীর মূর্তি নয়, পশু-পালক কৃষিজীবী সমাজের প্রজননের প্রতীক। নটরাজ মূর্তি কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতিকৃতি নয়, দুর্গা মূর্তি কোনো বাস্তব নারীর নয়, কতগুলো বিশ্বাস বা ধারণা থেকে এই প্রতীকগুলো এসেছে।

ভাস্কর্য একটি ত্রিমাত্রিক শিল্পমাধ্যম, তাকে চারদিক থেকে দেখা যায়, স্থাপত্য শিল্পের মতো ভাস্কর্য সরাসরি মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয় না। সকল শিল্পমাধ্যমের মূল কথাটি 'মৌলিকত্ব'। যে কোনো পণ্যের প্রথম ত্রিমাত্রিক মডেলটি সেই অর্থে ভাস্কর্য বলা যেতে পারে। প্রতীক প্রতিমা যখন বার বার কপি করা হয় তখন তা প্রতিমা বা মূর্তি হিসেবে গণ্য হয়, ভাস্কর্য নয়। 'অপরাজিতা বাংলা' একটি ভাস্কর্য, কিন্তু এর কপি কোথাও তৈরি করলে সেটি কিন্তু ভাস্কর্যের মূল্য পাবে না। আজকাল বিমূর্ত ভাবধারার শিল্পেরই দাপট বেশি, ভাস্কর্যেও বিমূর্ততা খুব দেখা যায়। আমাদের শহীদ মিনার একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য এবং এর কপি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই কপিগুলোও কার্যক্ষেত্রে শহীদ মিনার কিন্তু সেগুলোকে ভাস্কর্য বলা যাবে না। শহীদ মিনার স্মৃতির মিনার, তার সঙ্গে প্রার্থনার কোনো যোগসূত্র নেই। তেমনি ঢাকা শহরে সার্ক ফোয়ারা, দোয়েল বা বলাকা ভাস্কর্য আছে কিন্তু সেগুলো প্রতিমা নয়। সারা বিশ্বে ভাস্কর্যকে অন্যতম শিল্প মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় এবং এর বিষয়বস্তু সমাজের মননশীলতার পরিচয় বহন করে। সংস্কৃতিবান কোনো সমাজ স্থূলরুচির কোনো ভাস্কর্যকে জনসমক্ষে প্রদর্শিত হতে দেয় না। আমাদের দেশে ভাস্কর্য সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকায় শিল্পরুচিসমৃদ্ধ ভাস্কর্যকে বেছে নেওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। সে জন্যই নিম্নমানের শিল্প উঁচু পর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়।

কোনো ভাস্কর্য এক সময়ে প্রতিমা হয়ে যেতে পারে, কপি করলে মূর্তিও হবে। উল্টোটা হবে না। এই ব্যুৎপত্তিগত ভেদাভেদ আমাদের সৃষ্টি নয়, সারা দুনিয়ায় এমনভাবেই দেখা হয়।

মন্তব্য করুন