ধর্ষণ একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজে। ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে সম্প্র্রতি। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কি পারবে ধর্ষণ ঠেকাতে?

হরমোন (জৈব রাসায়নিক পদার্থ) আমাদের দেহে তৈরি হয় এবং বিভিন্ন ধরনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। টেস্টোস্টেরন একটি হরমোন যা মানুষের উগ্র আচরণ এবং যৌনক্রিয়াতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন মানুষের রক্তেও ঋতুভেদে টেস্টোস্টেরনের তারতম্য ঘটে। যদিও সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি এই ঋতুভেদে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কীভাবে উগ্র ব্যবহারে কাজ করে। তবে অনেক পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে যেগুলো ভীষণভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং ঋতুর সম্পর্ক যে আছে তা নির্দেশ করে।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমেরিকাতে শহরের অপরাধ প্রবণতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে কিছু কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে যখন আবহওয়া সবচেয়ে গরম থাকে (গ্রীষ্ফ্মকালে) এবং মানুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও বেশি থাকে। আবার মেরিল্যান্ড কারাগারে কয়েদিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উগ্র ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে গ্রীষ্ফ্মকালে। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যা আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ২৭,০০০ নারীদের ওপর জরিপ চালনা করে পাওয়া তথ্য, যে নারীরা তাদের স্বামী/সঙ্গীদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে গ্রীষ্ফ্মকালে।

এই তথ্য প্রমাণ করে, নারীর প্রতি পুরুষের নির্যাতন বেয়ে যায় গ্রীষ্ফ্মকালে যখন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা থাকে বেশি। অবশ্য আরও বিষয় জড়িত থাকতে পারে পুরুষদের আগ্রাসী আচরণের পেছনে, কিন্তু সর্বাগ্রে আবহাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জোহান ডিডিওন তার একটি বইয়ে লিখেছেন, সুইজারল্যান্ডে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে যায় ফোহেনের (চরম গরম এবং শুস্ক অবহাওয়া) সময়। মজার বিষয় সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন জেলার কোর্ট এটা শনাক্ত করেছে যখন মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করে তখন সেটা অপরাধ প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নাসার তথ্য মতে, বিগত ৩৫ বছর গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব পড়েছে চরমভাবে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। গ্রীষ্ফ্মের খরতাপের তীব্রতা বেড়েছে, বেড়েছে তার স্থায়িত্ব। ভেবে দেখার সময় এসেছে এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং কীভাবে আমাদের মতো ট্রপিক্যাল দেশের মানুষজনের হরমোন এবং আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কী ভীষণ শক্তিশালী প্রেরণা/মোটিভেশন সৃষ্টি করতে পারে যৌনক্রিয়া। প্রত্যেকটি সমাজেই দেখা গেছে বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা। তারা ক্ষেত্রবিশেষে চরম শাস্তিকেও উপেক্ষা করেছে প্রায়ই এসব ক্ষেত্রে। এটা সেসব সমাজের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে সত্যি যে, সব সমাজ অনেক বেশি রক্ষণশীল। যেমন, প্যাসিফিক গিলবার্ট দ্বীপের কথায়ই ধরা যাক। বিয়ের আগে মেয়েদের সতিত্বকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হতো সেখানে। যদি কোনোভাবে শনাক্ত করা যেত যে তারা বিবাহ-পূর্বক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে তবে মেয়ে এবং ছেলে উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো।

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বহু সমাজেই বিবাহ-বহির্ভূত মেলামেশার শাস্তি স্বরূপ মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা আছে। তারপরও কোনো নারী স্বামী বা তাদের আত্মীয়-স্বজন দ্বারা শরীরিকভাবে লাঞ্ছিত এমন কি খুন হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো পুরুষ এমন অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। এমন ভূরি ভূরি প্রমাণ আমাদের সমাজে রয়েছে। এ সব ঘটনা এটাই নির্দেশ করে যে, কোনো একটা দুর্দান্ত প্রেরণা/মোটিভেশন পুরুষকে লাঞ্ছনা বা মৃত্যুদণ্ডের ভয়কেও তুচ্ছ করে দেয়।

যদি তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডও যৌন আকর্ষণ নিরোধ করতে না পারে সে ক্ষেত্রে উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বা এ পথে পা বাড়াবে না সে ভাবনা খুবই হাস্যকর। আমেরিকার সরকার প্রতি বছর ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে হাইস্কুলের ছেলেমেয়েদের যৌনকার্য থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তু সম্প্র্রতি গবেষণায় দেখা গেছে যারা এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে তাদের সঙ্গে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়নি তাদের যৌন অভিজ্ঞতার তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এমনকি যারা একবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল তাদের অধিকাংশই ৫ বছর পর আবার সেই প্রতিজ্ঞা করতে চায়নি, কারণ তাদের স্মৃতিতে সেটা আত্মশ্নাঘার কারণ হয়। নিশ্চয়ইে যৗন আকর্ষণের পেছনে বিশেষ ধরনের কিছু শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ কাজ করে যেটা অন্য যে কোনো ধরনের আকর্ষণের চেয়ে আলাদা। হরমোন কী মানুষকে যুক্তিহীন প্রাণীতে পরিণত করে যখন তার ভেতর কামভাব প্রবলভাবে জাগে? টেস্টোস্টেরনসহ নানা ধরনের হরমোন কামভাবকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। তবে, মানুষকে নিয়ে সরাসরি এ সব বিষয়ে অনেক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এখনও। মৃত্যুদণ্ডের বিধান হয়তো ধর্ষণ নিরোধে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা নাও রাখতে পারে। এখন পর্যন্ত এটা পরিস্কার যে, পারিবারিক শিক্ষা এবং সুস্থ মানসিক গঠনের বিকল্প নেই ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠনে।

মন্তব্য করুন