একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২০   

শাহেদ কায়েস

কুড়িগ্রামের সরকারবাড়ি-পানাতিপাড়া কমিউনিটি স্কুলে বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করার একটা দৃশ্য আমি কখনো ভুলতে পারব না। এখান থেকেই গতবছর আমাদের ত্রাণ বিতরণ তৎপরতা শুরু করেছিলাম। স্কুল প্রাঙ্গণে ভিড় করা অনেক মানুষের মধ্যে এক বৃদ্ধার কথা মনে পড়ছে। বয়স কত হবে তার? সত্তর-পঁচাত্তর কিছু একটা। আসলে দুর্গম ওই সব চরাঞ্চলের মানুষগুলো বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ন্যুব্জ হয়ে পড়েন।

সরকারবাড়ি-পানাতিপাড়ায় আমরা নগদ টাকা বিতরণ করেছিলাম। হঠাৎ দেখি একটু দূরে গিয়ে টাকার খামটা খুলে টাকাগুলো হাতে নিয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। আমার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকায় হয়তো লজ্জা পেলেন। তারপর ধীরে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে চলে গেলেন। কেন সেদিন তিনি কেঁদেছিলেন, জিজ্ঞেস করার সুযোগ হয়নি। হাত পাতার গ্লানি না আনন্দাশ্রু? সামান্য কয়টা টাকা, হয়তো সেই মুহূর্তে সেটাই অনেক বড় ছিল তার জন্য। স্বেচ্ছাসেবীদের একজনকে এই ঘটনা বললে তিনি বললেন, 'আনন্দেই কেঁদেছেন, উনারা চাল-ডাল কিছু না কিছু পান নানা স্থান থেকে, কিন্তু নগদ অর্থ পান না বললেই চলে। তাই কারোর হয়তো ভাত খাওয়ার একটা প্লেট কেনা দরকার, কিন্তু কিনতে পারেন না। দুই হাজার টাকা অনেক বড় এই মুহূর্তে। কে জানে হয়তো ওষুধ কেনার টাকাটাও উনার নেই।'

দুর্গত অঞ্চলে নগদ টাকার সংকটটা আমি প্রথম অনুভব করেছিলাম সিডরের পর। সেই ছোটবেলা থেকেই দৈব-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করে আসছি আমি। কিন্তু সিডরে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছিল। বরগুনার আমতলী থেকে ট্রলারে প্রায় চার ঘণ্টা পথ চলার পর যেখানে গিয়ে থেমেছিলাম, সুন্দরবনের কাছাকাছি সেই জায়গাটির নাম এখন আর মনে নেই। স্থানীয় প্রশাসন আমাদের নিষেধ করেছিল। তবু একটু জবরদস্তি করেই আমরা ওখানে গিয়েছিলাম। কেননা, বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমার জানা আছে নাগরিক মধ্যবিত্ত ত্রাণ বিতরণের জন্য সহজ এলাকা খুঁজে নেয়। তাই এমন ভেতরে যাওয়া। কিন্তু সেখানকার মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের কাছে ত্রাণসামগ্রীর স্বল্পতা ছিল। সিডরের সপ্তাহখানেক পর আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। তখন পর্যন্ত সেখানে তেমন একটা ত্রাণ পৌঁছায়নি। মানুষগুলোর কাছে চাল-ডাল কিছুটা পৌঁছালেও লবণ ছিল না। তাই তারা আমাদের সঙ্গে থাকা লবণের প্যাকেটগুলোর ওপর হামলে পড়েছিল। এক প্যাকেট লবণ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে পাঁচ প্যাকেট পানিতে ফেলে নষ্ট করেছিল। সেবারই আমার মনে হয়েছিল, আমরা যদি নগদ টাকা নিয়ে যেতাম, তাহলেই ভালো হতো। এই তো কয়েক বছর আগে আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে দেখেছিলাম, তারা দামি দামি কম্বল স্বল্প টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে। কারণ তারা প্রয়োজনের তুলনায় কম্বল বেশি পেয়েছিল। কিন্তু নগদ টাকা ছিলই না বললেই চলে।

সরকারবাড়ি-পানাতিপাড়ার ওই বৃদ্ধার চোখে মাত্র দুই হাজারটা টাকা পাওয়ার পর যে দ্যুতি উদ্ভাসিত হতে দেখেছিলাম, তা আমি কোনোদিনই ভুলব না। গত বছর ২ আগস্ট আমরা ‘লেখক-শিল্পী সমাজ’-এর উদ্যোগে দেশের মানুষের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে কুড়িগ্রাম গিয়েছিলাম। সারারাত জার্নি করে খুব ভোরের দিকে পৌঁছলাম কুড়িগ্রাম সদরে। যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সেখানে ঘণ্টা দুই বিশ্রাম নিয়ে স্থানীয় সমাজকর্মী খন্দকার আরিফের সঙ্গে আমরা বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্যের দিকে। চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের সরকারবাড়ি-পানাতিপাড়া কমিউনিটি স্কুলে আমরা প্রথম পর্বে বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করি। 

চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর মোহনায় মনতলা চরে দ্বিতীয় পর্বে। এমন ছোট ছোট কিছু মানবিক গল্প  আছে, গত বছরের স্মৃতিতে। সবার অংশগ্রহণে বন্যাদুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা, নগদ অর্থ সহযোগিতা দিয়েছিলাম। খামটা হাতে নিয়ে কারো কারো মলিন চোখে-মুখে হঠাৎ হাসির অভিব্যক্তি দেখেছি।

বন্যার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে দেরিতে হলেও এবারও সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দু’টি এলাকা নির্বাচন করে আমরা পরিবারপ্রতি ২ হাজার টাকা করে দিতে চাই। শুধু লেখক-শিল্পী  নন, দেশ-বিদেশের যে কোনো পেশার যে কোনো নাগরিক এ উদ্যোগে অংশ নিতে পারবেন। 

এবারের বন্যা স্মরণকালের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে চলেছে। এক মাসের অধিক সময় ধরে চলা তিন দফা বন্যায় দেশের প্রায় ৩১ শতাংশের বেশি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বন্যায় এই পর্যন্ত ভাসিয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ফসল, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক। এখন পর্যন্ত দেশের ৩৪টি জেলার ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।

বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আর্থিক সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য আমরা আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি। সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। আগামী ৭ আগস্ট কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর, ঘোগাদহ এবং রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামে নগদ অর্থ সাহায্য বিতরণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে সাতক্ষীরার আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত পানিবন্দি দুটি এলাকায় অর্থসাহায্য বিতরণ করা হবে। আগামী ১২ আগস্ট, ২০২০ পর্যন্ত আমাদের তহবিলে অর্থসাহায্য পাঠানো যাবে। ৪টি ব্যাংক একাউন্ট ও ৭টি বিকাশ নম্বর দেওয়া হলো।

ব্যাংক একাউন্ট : Sakrito Noman, 1503202739897001, Brac Bank, Mogbazar branch, dhaka; Mojaffor Hossain, Dutch bangla bank, 16815132388; Md. ashraful haque, DBBL 147-103-19739; Sakrito Noman, Dutch bangla bank, 137.101.72952

বিকাশ (পার্সোনাল) নম্বর: স্বকৃত নোমান: 01818238320, 01972238320, মোজাফ্ফর হোসেন: 01717513023, আশরাফ জুয়েল: 01712080215, অরবিন্দ চক্রবর্তী: 01681468554, 01768179995, সিপাহী রেজা : 01794691878, আহমেদ শিপলু : 01301261407, হামিম কামাল : 01760238433

একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্ত মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন, এই প্রত্যাশা।

লেখক: কবি, পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী