অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকের ভূমিকা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২০   

আমজাদ হোসেন

আমজাদ হোসেন

আমজাদ হোসেন

করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মহামারি যেমন একদিকে হাজার হাজার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে এর প্রভাবে অর্থনীতিতে স্থবিরতাও নেমে আসছে। সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশেও প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও জীবিকায়। এই মহামারি প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য ব্যাহত করছে। এর ফলে তৈরি পোশাক,পর্যটন, এয়ারলাইনস, বাণিজ্য এবং পরিবহন ও ব্যাংকিং খাতগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই খাতগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর চক্রাকার প্রভাব অন্যান্য খাতগুলোকেও প্রভাবিত করবে।

আর্থিক খাত বিশেষত ব্যাংকিং খাত এমনিতেই বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে, তার ওপর এই মহামারির কারণে আরও সমস্যায় পড়বে। আর ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছে ব্যাংকগুলোর ওপর। এতে করোনা পরবর্তীতে অর্থনীতিকে সচল করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায় করতে হবে। এই সময়ে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, মুনাফা কমে যাওয়া নানা ধরনের সংকটে পড়বে ব্যাংকখাত।

ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সুশাসনের অভাব, খেলাপি ঋণের অসহনীয় চাপ, অদক্ষতা, ঋণ কেলেঙ্কারি, অনিয়ম এই খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে। বেসিক ব্যাংকের  আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঋণ কেলেঙ্কারি, সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) নজরকাড়া অনিয়ম, এনআরবিসি ব্যাংকের দৃশ্যমান অনিয়মসহ সব কেলেঙ্কারি ব্যাংকিং খাতকে অস্থির করে তুলেছে। অনেকগুলো ব্যাংক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকার ব্যাংকগুলোর ওপর ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ এবং আমানতের ওপর সুদের হার ৬ শতাংশে নির্ধারণ করে দিয়েছে যাতে তাদের আয়ের একটা বড় অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আবার এপ্রিল মে – এই দুই মাস সুদজনিত আয়কে ব্যাংকের আয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে নিষেধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সবগুলো ব্যাংক মিলে প্রায় ১৬-১৭ হাজার কোটি টাকার মত মুনাফা হারাবে।

দেশের এ কঠিন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য ও অনস্বীকার্য। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো এবং জিডিপির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকারদের এখন অনেক কাজ করতে হবে। ব্যাংকাররা এই মহামারির মধ্যে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময় যখন তাদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো দরকার, তখন অনেক ব্যাংক বেতন-ভাতা কমাচ্ছে। অনেকে ছাটাই করছে। এই দুঃসময়ে ব্যাংককর্মীদের বেতনে কাটছাঁট করলে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। কারণ সবার জীবনযাপনে অনেক পরিবর্তন আসবে, তাদের কর্মস্পৃহা কমে যাবে যার প্রভাব পড়বে খেলাপি ঋণ আদায়সহ নানাবিধ কার্যাবলীতে, যার ফলে ব্যাংকের ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি যেমন কমবে তেমনি কমবে মুনাফা।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর দেশের উন্নয়ন এবং আর্থিক সঞ্চালন অনেকটাই নির্ভর করে। মানব শরীরে ধমনী দিয়ে যেমন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত প্রবাহিত হয়, তেমনি ব্যাংকিং চ্যানেল দিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অর্থের সঞ্চালন ঘটে। করোনাকালে ও করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও আর্থিক পুনঃরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাতের সুসংগঠিত কার্যপ্রস্তুতি প্রয়োজন। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করোনা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক ও আর্থিক কার্যক্রমে ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অর্থনৈতিক পুনঃরুদ্ধারে সহযোগিতার পাশাপাশি নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়ও মনোযোগ দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি উচ্চপর্যায়ের কোভিড-১৯ ঝুঁকি মোকাবিলা কমিটি করতে হবে। এ ছাড়া সরকারকেও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতিকে সচল করতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি করার জন্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশের ব্যাংক খাতেও মার্জার হতে পারে। এটিএম বুথ শেয়ারের মাধ্যমে সংখ্যা কমিয়ে আনা যেতে পারে। এতে ব্যয় কমে আসবে।

ব্যাংকের সবচেয়ে বড় স্টেক হোল্ডার আমানতকারীদের দিকটি দেখতে হবে। তারা টিকে থাকলে ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে। ব্যাংককে টিকে থাকতে হলে একটি পরিকল্পনা অবশ্যই থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে অর্থনীতির সব খাত জড়িয়ে পড়ছে। এজন্য ব্যাংক সমস্যায় পড়লে সব খাত সমস্যায় পড়বে। এ বছরের বৈদেশিক সহায়তার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। এখনই বিশ্বব্যংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এআইআইবি, আইডিবি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যবস্থা এমনভাবে নিতে হবে যাতে করে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিময় হারের মধ্যকার ভারসাম্য বিনষ্ট না হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও টেকসই করতে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি ব্যাংকসমূহ বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার

sapamzad2115@gmail.com