করোনাকালীন ঈদুল আযহা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০   

আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া

 আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া

আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া

পুঁজিবাদী সমাজে ধনীরা সাধারণত মুক্ত-স্বাধীন থাকেন। কিন্তু, করোনার আতঙ্কে ধনীরাও ঘরবন্দি জীবন যাপন করছে। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন সময় থেমে থাকে না, আর সেই সময়ের পরিক্রমায় আগমন ঘটছে ঈদুল আযহার। আমাদের সমাজে উৎসবগুলোতে সবাই সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চায়। উৎসব মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতার বলয় থেকে বের করে মিলন মেলায় শামীল করে। কিন্তু এখন সে মিলনে বাধ সেধেছে কভিড- ১৯। সামাজিক দূরত্ব সামাজিক মিলনকে সীমিত করে দিয়েছে। মানুষ নতুন স্বাভাবিকতায় নতুন রীতিতে উৎসব উদযাপনের চেষ্টা করছে।

'মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়। কারণে ও অকারণে বদলায়, সকাল ও বিকালে বদলায়।' মুনির চৌধুরীর বিখ্যাত এ উক্তি বড়ই সত্য। তবে করোনার কারণে আজ শুধু ব্যক্তিমানুষ নয়, মানুষের জীবন-জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব-আনন্দ, অর্থনীতি, শিষ্টাচার সবই বদলে গেছে।বছরে দুটি ঈদ। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা। করোনাকালেই পালিত হয়েছে ঘরবন্দি ঈদুল ফিতর। করোনা কবে যাবে আমরা জানি না। ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদও করোনাকালেই পালন করতে হবে। আমরা আশা আর স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি। সময় যতই বিরূপ হোক না কেন মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখে। করোনার এ ঘোর অমানিশা শেষে আসবে নতুন ভোর। এ আশাতেই স্বাগত ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার অন্যতম আনুষ্ঠানিকতা হলো পশু কোরবানি। 

কোরবানির সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিম মিলতাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ:) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ:) এর ত্যাগ ও উৎসর্গের অনন্য ইতিহাস। মহান আলতাহ্‌র পক্ষ থেকে হযরত ইব্রাহিম (আ:) এর ওপর নির্দেশ ছিল তাঁর প্রিয় পুত্র কুরবানির বা উৎসর্গের। তিন ছুরি চালিয়েছিলেন প্রিয় শিশু পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:) এর গলায়। আলতাহ খুশি হন। আলতাহর কুদরতে পুত্রের বদল কোরবানি হয় পশু। 'প্রিয়বস্তু' উৎসর্গের চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হযরত ইব্রাহিম (আ:) আর ধৈর্যের পরম পরীক্ষায় পাশ করেন হযরত ইসমাইল (আ:)। এই অনন্য ত্যাগের মহিমাকে স্মরণীয় করে রাখা হয়েছে ঈদে পশু কোরবানির মাধ্যমে।

ঈদুল আজহায় সারা বিশ্বের মুসলমানরা সাধ্যমতো পশু কোরবানি করবেন। ঈদুল আজহা একদিকে ত্যাগের পরীক্ষা অন্যদিকে আনন্দের উৎসব। পশু কোরবানি দেওয়া সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ওয়াজিব বা বিশেষ কর্তব্য। পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগ আর উৎসর্গের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান আলতাহ্‌পাকের সন্তুষ্টি অর্জনই কোরবানির মূল উদ্দেশ্যে। কোরবানি দেওয়া পশুর রক্ত-মাংস কিছুই স্রষ্টার কাছে পৌঁছে না, শুধু পৌঁছে তাকওয়া। অনেক মুসলিম এটি বুঝতে না পেরে ত্যাগের উৎসবকে ভোগ আর প্রদর্শনীর মহড়ায় পরিণত করে। অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে সর্বোচ্চ দামে বড় পশু কেনা অর্থ-বিত্তের উৎকট প্রদর্শনী বৈ অন্য কিছু নয়। বিত্তের প্রতিযোগিতা বা বৈভবের প্রদর্শনী নয়, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রেখে কোরবানি করাই আসল কোরবানি। পশু জবাইয়ের সাথে সাথে মনের পশুকেও কোরবানি দিতে পারলেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।

একটি জাতির ভাষা, ধর্ম, উৎসব, ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি নিয়েই তার সংস্কৃতি। মানবতার কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম খুব ভালো করেই তা বুঝতেন। সে কারণেই নজরম্নলের কবিতায় ধর্মীয় উৎসব এবং এর উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও শিক্ষা এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম তাঁর 'কোরবানী' কবিতায় কোরবানির আসল উদ্দেশ্য সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন,

"ওরে হত্যা নয় আজ' সত্যাগ্রহ' শক্তির উদ্বোধন\হদুর্বল! ভীর"! চুপ রহো, ওহো খামাখা ক্ষুব্ধ মন ! ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর, আজিকার এ খুন কোরবানীর ! "

এই করোনাকালে একদিকে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিতরা জীবন ও জীবিকা উভয়ের জন্যই লড়াই করছে। অন্যদিকে এক শ্রেণীর মানুষের লোভ আর ভোগের পেয়ালা উপচে পরছে। তারা কী লোভকে দমন করে ভোগকে কমিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে? যদি না দাড়ায় তাহলে তার পশু কোরবানি বৃথা।যে আলতাহ পাকের উদ্দেশ্যে কোরবানি, তাঁর অভুক্ত - অসহায় বান্দার প্রতি মমতা ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা। এ বছরের ঈদুল আজহা দরদী সমাজ আর মানবিক পৃথিবী গড়ায় মানুষের ভেতরের পশুত্বকে দমিয়ে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলুক।

লেখক  ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।