হিদাইরখালের ন্যায়বিচার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০   

আব্দুল হাই আল-হাদী

হিদাইরখাল। নামের সাথে 'খাল' শব্দটি থাকলেও আদতে এটি একটি প্রমত্তা নদী। স্থানীয়ভাবে নদীটি 'হিদাইরখাল' নামে পরিচিত হলেও সরকারি নথিপত্রে নদীটির নাম 'বাউলিখাল'। একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হাজারখানেক মানুষের যোগাযোগ সুবিধার দোহাই দিয়ে এ নদীর উৎসমুখে একটি বাঁধ তৈরি করে পানির পথ বন্ধ করেছে। এতে বাউলিখাল নদীকে-ই কেবল গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে না, পুরো একটি অঞ্চলের মানুষের চর্চিত সংস্কৃতি, পরিবেশ, ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্রকে হুমকীর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। চলমান বন্যায় এ বাঁধের প্রভাব মানুষেরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে।

সিলেটের সারি নদী লালাখাল পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর ক্রমশ: পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে। চলতি পথে এটি যে কয়েকটি বাঁক নিয়েছে, এর মধ্যে মঞ্জিলতলা পয়েন্টটি অন্যতম। এখানে নদীটি ইউ টার্ন নিয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়েছে। বাঁকটি গোয়াইঘাট উপজেলার পূর্ব-আলীরগাঁও ইউনিয়নের মঞ্জিলতলা বাজার ও কাকুনাখাই গ্রামের মধ্যে অবস্থিত। সারি নদীর এ বাঁক থেকে বাউলিখাল নদী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। উৎসস্থলের ৪/৫ কি.মি. এলাকার মধ্যেই সারি নদীতে এসে আর প্রায় ১০ টি নদী ও ছড়া এসে মিলিত হয়েছে। পাহাড়ি এসব নদীর পানিপ্রবাহ যখন সারি নদীতে প্রচন্ড চাপের সৃষ্টি করে তখন তা বাউলিখাল নদী সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতো।

বাউলিখাল নদীর এ উৎসমুখেই ২০১৬ সালে প্রায় ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের বাঁধটি নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ২০১৭ সালে তা সমাপ্ত হয়। বাঁধটির উচ্চতা নদীগর্ভ হতে প্রায় ৫০ ফুট। বাঁধটি নির্মাণে প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে যেটি স্থানীয় এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ব্যয় করা হয়েছে। ভুল বুঝিয়ে স্থানীয় সাংসদ, উপজেলা পরিষদ থেকেও অনুদান গ্রহণ করা হয়।

উৎসস্থল থেকে নদীটি অনেকগুলো হাওর-বাওর-বিল-জনপদ অতিক্রম করে প্রায় ১০ কিমি পর আরও কয়েকটি ছোট-খাটো খালের সাথে মিলিত হয়ে 'বেকরা' নাম ধারণ করে ক্রমশ: চলে গেছে দক্ষিণ দিকে। পরবর্তীতে এটি ফতেহপুর ইউনিয়নের মানিকগঞ্জ বাজারে কাপনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে রাতারগুল জলারবনের মধ্য দিয়ে পুনরায় সারি নদীতে পতিত হয়েছে। এ নদীর তীরে জুগিরকান্দি নামক সোয়াম্প ফরেস্ট ও বনবিভাগের একটি বড় মুর্তাবাগান রয়েছে। বনবিভাগের মুর্তাবাগানটি বালির হাওর নামক হাওরে অবস্থিত। বেকরা ও কাপনা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দু'টি স্বীকৃত নদী।

হিদাইরখাল নদীর উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণের কারণে একটি মাত্র লাভ হয়েছে। এপারের সাথে ওপারের যোগাযোগ স্থাপিত হওয়া ছাড়া কোন লাভের দিক নেই। অবশ্য বাঁধ নির্মাণের কলা-কুশলী কিছু মানুষেরও বিরাট লাভ হয়েছে। কিন্তু এ লাভের বিপরীতে ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। বাঁধটির কারণে ভাটির চেয়ে উজানের জীবন ও জনপদের ক্ষতি হচ্ছে অনেক বেশি। কারণ পাহাড়ী ঢলের সময় সারি নদীতে যে পানি প্রবাহিত হত তার প্রায় এক তৃতীয়াংশ পানি বাউলিখাল নদী দিয়ে প্রবাহিত হত। পানি বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় বর্তমানে পাহাড়ি ঢলের সময় সারি নদীর পানির উচ্চতা কয়েক মিটার বেড়ে যায়। এতে পানির স্থায়িত্বও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। যার কারণে এটি তীরবর্তি জনপদকে পতাবিত করছে, পানির স্থায়িত্ব বাড়ার কারণে মাটিকে সহজেই নরম করে ফেলছে। এতে নদী ভাঙ্গন তীব্রতর হয়েছে। এ বাঁধ নির্মাণের আগে পাহাড়ি ঢলের সময় যে পানি ৪/৫ ঘন্টার মধ্যেই চলে যেত সে পানি নামতে এখন কয়েকদিন সময় লাগছে। এ বাঁধ নির্মাণের আগে যে মানুষজন কোনদিন কোন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়নি, তাদের চোখের জল বানের পানিতে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এছাড়া যে কয়েকটি আন্ত:সীমান্ত নদী ও ছড়া সারিতে এসে মিলিত হয়েছে, বর্তমানে সে নদীগুলোও অস্বাভাবিক আচরণ করছে। সেগুলোর তীর ও তীরবর্তি লোকজনও মারাত্বক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। বাঁধের ভাটি অংশেও ক্রমান্বয়ে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

হিদাইরখাল বাঁধ নির্মাণের কারণে সারি নদী, বড়গাঙ্গ, কাটাগাঙ্গ, নয়াগাঙ্গ, কলসী, নাপিতখাল, বেকরা, পোড়াখাই, চিকারখাল, খাফনাখাল, কচুয়াখাল, খটখটি, কুয়াইখাল, ছাগলখাউরি, খাসি নদী, বাউরিখাল, পুটিখাল, নলজুরীখাল মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এসব নদী তার চিরচেরা রৃপ হারিয়ে রম্নুদ্ররৃপ ধারণ করে গ্রাস করছে পাশ্ববর্তী জনপদ ও ফসলী জমিকে। হিদাইরখাল বাঁধের কারণে ৩৪ টি হাওর মারাত্বকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

এগুলো হচ্ছে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সানকীভাঙ্গা হাওর, আসামপাড়া, আসামপাড়া হাওর, চৈলাখেল ৯ম খন্ড, চৈলাখেল ৮ম খন্ড, বাউরভাগ হাওর, নয়াগাঙ্গেরপার (একাংশ), আলীরগাঁও ইউনিয়নের বুধিগাঁও হাওর, নাইন্দা হাওর, তিতকুলতী হাওর, লাম্বাডুবা হাওর, বালির হাওর, দাড়াইল, রউয়া,টুকা, ঘাড়দাড়াইল, রউচুলিত, হালাং, কুরিমঞ্জ, টুপলং, ছোট টুপলং, খলারকর, কচুবিল, রউয়া, কুকুরমারা, দেওচাপরা, বাগচাপরা, জুগিরকান্দি, বালির হাওর বা মুর্তাবন এবং জৈন্ত্মাপুর ইউনিয়নের চাতলা হাওর, বড় চাতলা হাওর, বাওন হাওর, মেদল হাওর, ডিবির হাওর, কেন্দ্রী হাওর, বিরাইমারা হাওর, বড়বিল হাওর ইত্যাদি।

হিদাইরখাল বাঁধের কারণে প্রায় ৩৪ টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে  ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। এসব গ্রামের মধ্যে বিড়াখাই, হাটিরগ্রাম, গাথি, ডুল্টিরপার, চাতলারপার, শেওলারটুক, মলিতফৌদ, কান্দি, বাউরভাগ, কৈনাখাই, ভিত্রিখেল, গুফরাজান, খাড়ুবিল, ববরবন্দ, লামনীগ্রাম, কাটাখালসহ কাকুনাখাই খলা, রাজবাড়ীকান্দি, লক্ষীপুর ১নং, লক্ষীপুর ২ নং, নলজুরি, আসামপাড়া, কাকুনাখাই খলা, আগফৌদ, নয়াখেল, টিকর নয়াখেল, পুড়াখাইপার, আনন্দবাজার, সিমারবাজার, মুখতলা,জাফলং চা বাগান, নয়াবস্তি, জুমপার, রাধানগর, কান্দুবস্তি, নয়াবস্তি, জাফলং বাজার, মুক্তাপুর উল্লেখযোগ্য। 

হিদাইর খালের ভয়াবহতার কারণে অত্রাঞ্চলের মানুষজন কৃষি আবাদ, যাতায়াত, মাছ সংগ্রহ এবং গৃহপালিত গবাদিপশু পালনে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হচ্ছেন। এছাড়া হিদাইরখাল বাঁধের কারণে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে নির্মিত বেড়িবাঁধ ও স্তুইটগেইট ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সারি-গোয়াইন প্রকল্পও মারাত্বভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

ভাটি অঞ্চলে বন্যার পানি না ঢুকার কারণে সেখান জমির উর্বরতা কমে গেছে, দেখা দিয়েছে আগাছার প্রাদুর্ভাব। জেলেরা মাছ না পাওয়ার কারণে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। সোয়াম্প ফরেস্ট, মুর্তাবনের জীববৈচিত্র হারিয়ে যাচ্ছে। মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণির চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পানির স্ত্মর নীচে নেমে গেছে। খাবার ও সেচের পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এক কথায়, হিদাইরখাল বাঁধ উত্তর-পূর্ব সিলেট বিশেষ করে জৈন্ত্মাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রাণ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর মারাত্বক প্রভাব ফেলছে। বদলে যাচ্ছে বিস্ত্মির্ণ এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি। পরিবেশবাদীদের আশংকা, বাঁধটি অপসারণ না করা হলে পুরো এলাকাই মরুময়তার দিকে ধাবিত হবে।

স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই এ বাঁধের বিরোধীতা করে আসছেন। ইতিমধ্যেই বাঁধের উপর অবস্থান কর্মসূচি, গণজমায়েতসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকের কাছে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষজন বাঁধটি অপসারণের জন্য একাধিকবার স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। বিভাগীয় কমিশনারও জেলা প্রশাসককে বাঁধটি দ্রুততম সময়ে অপসারণের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। কিন্তু কিছুতেই মরণফাঁদ এ বাঁধটি অপসারিত হচ্ছেনা। প্রচলিত আছে যে, ব্রিজের পরিবর্তে এ বাঁধ নির্মাণ শুধুমাত্র একটি প্রভাবশালী মহল নিজেদের ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের কাজে লাগিয়েছে। সে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীই বাঁধটি যাতে অপসারণ করা না হয়, সেজন্য নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সহজ যোগাযোগের জন্য একটি ব্রিজ প্রয়োজন। সে ব্রিজের দাবির পরিবর্তে হাজারখানেক মানুষের যোগাযোগের সুবিধার জন্য একটি নদীকে হত্যা কোনভাবেই যৌক্তিক নয়। কাজটি প্রচলিত আইনেরও সম্পূর্ণ বিরোধী। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্য দিবালোকে এরকম একটি অবৈধ ও বেআইনি কাজ কিভাবে সংঘটিত হল-সে প্রশ্ন উল্‌থাপন করা খুবই স্বাভাবিক। যে টাকা বাঁধটি নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে, তা দিয়ে সহজেই একটি সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। হাজারখানেক মানুষের জন্য লক্ষাধিক মানুষ ও বিস্তির্ণ জনপদকে মরুময়তার দিকে ঠেলে দেওয়া কিছুতেই করতে দেওয়া উচিত না। প্রয়োজনে বাউলিখাল নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ করে হলেও এ বাঁধ অপসারণ করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি নদীর উৎমুখে বাঁধ নদীকে হত্যা কোনভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারেনা।

লেখক ও পরিবেশকর্মী

বিষয় : বাউলিখাল