কৃষিজাত পণ্য আমদানি-রপ্তানিতেও প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২০   

সৈয়দ মুনিরুল হক

বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত শব্দ 'কোয়ারেন্টাইন'। যদিও এর ইতিহাস বহু পুরোনো।কোয়ারেন্টাইন বাংলায় 'সংগনিরোধ' শব্দটি এমনিতে কিছুটা দুর্ভেদ্য প্রকৃতির।

আগামী দিনের বিশ্ব পরিস্থিতি কি হবে আর আমাদের জন্যই বা কি অপেক্ষা করছে তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। এরই মধ্যে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আগামীতে খাদ্য সংকট হতে পারে মর্মে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এরই মধ্যে সতর্ক করেছেন। কৃষি মন্ত্রালয়ের দায়িত্বে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয় করোনা পরবর্তী খাদ্য সমস্যা মোকাবিলার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন থেকে করোনা পরবর্তী কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী বরাবর কিছু প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। কৃষি খাদ্য আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি ফসল ফলানোর কাজে লাগানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সাথে সাথে ব্যবহার করতে হবে লাগসই প্রযূক্তি। আর ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করতে হবে সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি। সরকারি নির্দেশনা মেনে সরকারী, বেসরকারী বা স্বায়িত্বশাসিত প্রতিটি অফিসের পতিত জমি কৃষি কাজে লাগানোর কার্যকরী উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আগামী দিনের কৃষিতে করোনার মতো অজানা রোগ জীবাণু সংক্রমণ ঘটলে খাদ্য সমস্যা যে প্রকট থেকে প্রকটতর পর্যায়ে পৌঁছে দুর্ভিক্ষও হতে পারে। কাজেই আগামী দিনের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন (উদ্ভিদ সংগনিরোধ) ব্যবস্থাপনা কিভাবে আরো কার্যকরী ও যুগোপযোগি করা যায় তা এখন থেকেই চিন্তা ভাবনা করা দরকার। নয়তো আগামী দিনের কৃষিতেও করোনার মতো অজানা রোগজীবাণু সংক্রমণের ভয়াল থাবায় খাদ্য সমস্যা প্রকটতর পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। পেষ্ট রিস্ক এনালাইসি (পিআরএ) ও এক্রিডিটেড ল্যাবরেটরী স্থাপন সংক্রান্ত এক বা একাধিক প্রকল্প দ্রুদ হাতে নেওয়া দরকার। তাছাড়া আমাদের দেশের প্রক্রিয়াজাতকৃত কিছু পণ্য উন্নত বিশ্বে রপ্তানী হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আইচ পপ, ললি পপ জাতীয় পণ্য ইউভূক্ত দেশে রপ্তানি করা হতো। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর মধ্যে ক্যারাজিনন নামক মাত্রাতিরিক্ত কারসেনোজেনিক উপাদান ফুড এডিটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে মর্মে ইউ-ডিরেক্টটিভস অনুযায়ী নিশ্চিত করেন, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফলে এর মাধ্যমে ক্যান্সার সহ নানাবিধ রোগ সৃষ্টি হতে পারে। এমনি এক কঠিন বাস্তবতায় 'প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন' এর গুরুত্ব এবং সমসাময়িক ভাবনা নিয়ে কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার প্রয়াসে আজকের এই লিখনি।

বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির কারণে দানাদার খাদ্যশস্যের পাশাপাশি শাক সবজি ও ফলমূল উৎপাদনে দেশে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শাক-সবজি উৎপাদনে বিশ্বে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। কিন্তু উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য রপ্তানির এক বিশাল সম্ভবনা থাকলেও সেই সুযোগ আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের দেশে কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে এখনো অর্গানিক ফার্মিং/ কনট্রাক্ট ফার্মিং এর ব্যাপক প্রসার ঘটেনি। ফলে প্রথাগতভাবে কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক, সার ইত্যাদি ব্যবহার হচ্ছে। আর কনট্রাক্ট ফার্মিং ছাড়াই কৃষিজাত এই সব পণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত তাতে কি কি ইনপুট (সার, কীটনাশক ইত্যাদি) কি মাত্রায় কখন প্রয়োগ করা হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়না। ল্যাবরেটরির সাথে সম্পৃক্ত জনবলকে যে জায়গায়ই হোক না কেন কোয়ারেন্টাইন ল্যাবরেটরীর কাজে সম্পৃক্ত না রাখতে পারলে দেশ বিদেশের যত উন্নত প্রশিক্ষণই দেয়া হোক না কেন তা ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হতে বাধ্য। 

বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র হিসাবে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সমুদ্র বন্দর ও হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মাধ্যমে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যে রপ্তানির নিমিত্তে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত একটি প্যাকিং হাউজ নির্মাণ করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে পণ্যের দ্রুত ইন্সপেকশন ও পরীক্ষা করে গ্রেডিং, সরটিং, প্যাকেজিং এর মাধ্যমে ফাইটোসেনিটারি রিকয়ারমেন্ট পূরণ সাপেক্ষে রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

বিজ্ঞান এবং তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট 'কীটনাশক সংক্রান্ত গবেষণা ও পরিবেশের অবশিষ্টাংশ পরিবীক্ষণ' শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে শাক সবজি সংগ্রহ করে কীটনাশক অবশিষ্টাংশের বিষক্রিয়ার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সে সময় দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য এমআরএল বা একসেপটেবল ডেইলি ইনটেক (এডিআই) মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান বাস্তবতায় এমআরএল নির্ণয়ের জন্য সহায়ক ল্যাবরেটরী হিসাবে পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব ফুড রেডিয়েশন এন্ড বায়োলজির (আইএফআরবি) ল্যাব অথবা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) ল্যাবে ক্রস চেক এনালাসিস করা যায় কিনা সেটাও চিন্তা করা যেতে পারে।

উন্নত যন্ত্রপাতির সাথে সাথে দক্ষ জনবল, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কাজের জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করণের মধ্যে দিয়ে আগামীতে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে উল্লেখয়োগ্য ভূমিকা রাখবে সেটাই সকলের প্রত্যাশা। কৃষিজ পণ্যে রপ্তানি বৃদ্ধির নিমিত্ত বাংলাদেশের হাইকমিশন/দূতাবাসে কর্মরত কমার্শিয়াল কাউন্সেলেরগণের উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রয়োজনে এই সংক্রান্ত সেল গঠন করে দেশওয়ারী পণ্যের চাহিদা এবং ফাইটোসেনেটারী শর্তসমূহ সংগ্রহ করে আমাদের দেশ হতে কিভাবে শর্ত পূরণ করে আরো অধিকতর কৃষিজ পণ্য রপ্তানী করা যায় এই ব্যাপারে বিদেশি দূতাবাসে কর্মরত কর্মাশিয়াল কাউন্সেলরগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাংলাদেশি দূতাবাসে নিযুক্ত কানাডা, আমেরিকান কর্মাশিয়াল কাউন্সেলর মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশি স্টেক হোল্ডারদের সাথে মতবিনিময় করেন যেন তাদের দেশে উৎপাদিত পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তার সাথে তাল মিলিয়ে প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন এর নিজস্ব কোন ওয়েব সাইট এখনো নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যে ওয়েব সাইট আছে, সেখানে কোয়ারেন্টাইন উইং এ ঢুকলে যে অল্প বিস্তর তথ্য পাওয়া যায় সেটা যথেষ্ট নয়, আবার আপগ্রেড নয়। 

এমতাবস্থায় বিদেশি কোন আমদানীকারক বাংলাদেশ থেকে কোন কৃষি বা কৃষিজাত পণ্যের সঠিক তথ্যের অভাবেও আমদানী করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন এটাই স্বাভাবিক। আবার কোয়ারেন্টিন কার্যক্রমে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু না হওয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে নকল ছাড়পত্র (আরও) দিয়ে সিএন্ডএফ এজেন্টগণ কাস্টম থেকে মাল খালাস করছেন মর্মে জানা যায়।

এমতাবস্থায় জরুরী ভিত্তিতে অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু করে অন্যান্য ষ্টেক হোল্ডারদের সাথে ওয়েব সাইট ইন্টার লিংক থাকলে এর একটি সহজ সমাধান সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

প্রত্যেক দেশেই তার নিজস্ব খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রেখেই রপ্তানি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদেও পাশ্ববর্তী দেশ ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধ ঘোষণা করে সাথে সাথে পেঁয়াজের মূল্যে অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে আমদানীকারকরা ভারতের বিকল্প খুঁজতে থাকে। সেই কঠিন বাস্তবতায় প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন উইং দ্রুত চীন, মিশর, মায়ানমার, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পেঁয়াজ আমদানী করার আমদানী অনুমতিপত্র (আইপি) ইস্যু করেন। ফলে বিভিন্ন দেশ হতে আমদানীর ফলে পেঁয়াজের মূল্য স্বাভাবিক হতে থাকে। কাজেই কোন একক দেশের উপর থেকে কৃষি পণ্য আমদানী নির্ভরতা কমাতে হবে। কৃষি আমদানী রপ্তানীর জন্য নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করা জরুরি। এই কঠিন বাস্তবতা উপলদ্ধির এখনই প্রকৃত সময়। একই কথা এনিম্যাল ও ফিস কোয়ারেন্টাইন এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কাজেই বর্তমান বাস্তবতায় কোয়ারেন্টাইন এর গুরুত্ব অনুধাবন করে যদি সম্মিলিত ভাবে 'কোয়ারেন্টাইন সপ্তাহ' বা 'কোয়ারেন্টাইন দিবস' হিসাবে ঘোষণা করে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এর তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয় তবে সাধারণ মানুষের কাছে কোয়ারেন্টাইন এর গুরুত্ব অধিকতর অনুভূত হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। কারণ জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণ ব্যতীত কোন আইনও যথেষ্ট নয়। 

সংশ্লিষ্ট মহল এই ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করে দ্রুত যুগোপযোগী ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই প্রত্যাশা।

লেখক কোয়ারেন্টাইন প্যাথোলজিস্ট, সমুদ্র বন্দর, চট্টগ্রাম

syedhq74@gmail.com