আফগানিস্তানে সহিংসতা ও উপমহাদেশের শঙ্কা

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০     আপডেট: ২৩ মে ২০২০   

চয়নিকা সাক্সেনা ও অয়নাংশ মৈত্র

প্রায় দু’দশক ধরে যুদ্ধদীর্ণ আফগানিস্তান। তিন কোটির অধিক আফগানের প্রাত্যহিকীকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে, প্রতিদিনের হত্যালীলা, হিংসা এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপ।

এবছর ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহাতে, আফগান সরকারের অনুপস্থিতিতেই তালেবান নেতা মোল্লা বরাদর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগান বিষয়ক প্রধান দূত জালমে খলিলজাদ একটি চার পাতার শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। প্রত্যাশা ছিল এ চুক্তি হবে অনন্য এক আগামীর সন্ধিক্ষণ। বহু প্রতিক্ষিত প্রশান্তির বাতাস বইবে দেশজুড়ে। বদলে দেবে দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট, ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ। কিন্তু শান্তি চুক্তির পরেও, বিস্ফোরণ, হত্যালীলা ও  হিংসাত্মক কার্যকলাপ অব্যাহত। উনিশ বছর ধরে চলতে থাকা এ যুদ্ধে আসলে জয়ি হল না কোন পক্ষই। যদিও কিছু উগ্রপন্থি সংগঠন মার্কিন প্রশাসনের এই আপসমূলক আচরণকে, মূলত তালিবানের কাছে নতি স্বীকার হিসেবেই দেখেছে।

তালিবানের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের জন্য, আফগান রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানি তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেছেন। এই অচলাবস্থায় শান্তি আলোচনার অভিপ্রায়ে ডাকা নিখিল আফগান সংলাপ অনিশ্চিত মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, কোভিডে-১৯ এর প্রাদুর্ভাব বা বৈশ্বিক মহামারি আফগান শান্তি প্রক্রিয়ার গতি করেছে শ্লথ। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আবহ এখন শান্তি আলোচনার অনুপযোগী। মার্কিন-তালেবান শান্তি চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে সরকারি কর্মী ও তালেবান সেনা প্রত্যর্পণ না করা হলেও, ১০০০ তালেবানি ও ২৫৩ জন সরকারি কর্মীকে মুক্ত করে আফগান সরকার ও তালেবান।

সম্প্রতি কাবুলের একটি হাসপাতালে সদ্যজাত শিশু, প্রসূতি ও গর্ভবতী মহিলাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে আততায়ীরা। মার্কিন সূত্রে জানানো হয়েছে, মূলত শান্তি চুক্তির সহিংস বিরোধিতা করতে আইএস- খোরাসান এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। তালেবানের সঙ্গে সন্ধির পর, গুরুদ্বার, হাসপাতাল, বাজারসহ নানা জায়গায় ক্রমাগত  হত্যা চলছে। হামলার লক্ষ্য বদলাচ্ছে, অপরিবর্তিত থাকছে উপলক্ষ।   

যুদ্ধবিধ্বসস্ত আফগানিস্তানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভারতের অবদান অসীম। তালেবান শাসনের অবসানের পর, বলিউডের সিডি আর আফগান শিশুদের জন্য উপহার সামগ্রী  নিয়ে কাবুল আসেন ভারতের সাবেক বিদেশ মন্ত্রী। গণতন্ত্র ব্যবস্থা  নিশ্চিত করতে, নানা আন্তরিক প্রচেষ্টা নেয় নয়াদিল্লী।  দেশটির সংসদ ভবন, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, সালমা ড্যাম, বেশ কিছু বিদ্যালয়, ভারতের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত। সামরিক হেলিকপ্টার দান, প্রতিরক্ষাসহ, নানা খাতে রয়েছে ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান । আফগানিস্তানের উন্নয়নে, প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি আর্থিক সাহায্য করছে নয়াদিল্লী। চিকিৎসা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কাবুল ও দিল্লীর সম্পর্ক ক্রমে হয়েছে নিবিড় থেকে নিবিড়তর। ভারত ও ভারতীয়দের সম্পর্কে বন্ধুত্বমূলক মনোভাব পোষণ করেন আফগানরা। পোশাক, খাদ্য ও খাদ্যশস্য সামগ্রী আমদানিতে, আফগানিস্তান প্রাধান্য দিচ্ছে ভারতকে। চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতে আসছেন আফগানরা। খাদ্য ও খাদ্যশস্য সামগ্রী  প্রস্তুতিকরণসহ নানা ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হয়েছে আফগানিস্তান। ক্রমে বাড়ছে দেশজ সামগ্রীর রপ্তানির মাত্রা ও গন্তব্য, যা কাবুলের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এবং পরোক্ষে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বিশেষ সহায়ক।

আফগানিস্তানের মাটিতে সামরিক বাহিনীর পদচিহ্ন রাখতে চায়নি দিল্লী। ভারতের দাবীকৃত আফগান সীমানা, পাক-প্রশাসিত কাশ্মীরের অন্তরগত হওয়ায়, সরাসরি আফগান ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে স্থলপথ ব্যবহার করতে পারবে না ভারতীয় বাহিনী। নয়াদিল্লীর বিদেশনীতির ব্যকরণ মেনেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেনি ভারত।

আফগানিস্তান থেকে পেন্টাগনের সেনা প্রত্যাহারের পর, আফগানিস্তানে স্থিতাবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে, ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই পাশে পেতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। ২০০১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের 'গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর' পলিসিতে সঙ্গ দিলে, পাকিস্তান ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক হয় উষ্ণতর। সামরিক, কৌশলগত ও বাণিজ্যিক অংশীদারির কারণে ওয়াশিংটন ডিসির কাছে পাকিস্তানের গ্রহণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই বাড়ে।

বলা বাহুল্য, আফগানিস্তানে তালেবান ও অন্য মৌলবাদী দ্রোহ মোকাবিলায় ইসলামাবাদের মুখাপেক্ষী হয় হোয়াইট হাউস। যুদ্ধদীর্ণ আফগানদের আশ্রয়সহ বেশ কিছু সহায়তা দিলেও, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের যে অবদান তা মূলত নেতিবাচক এবং একান্ত কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য। কার্যত কাবুলে একটি অস্থায়ী, দুর্বল ও মিথোজীবী সরকারের প্রত্যাশী পাকিস্তান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের একটি সমীক্ষাও এই ব্রতির ই প্রতিধ্বনি দেয়।

আফগানিস্তানের ক্রমাগত বেড়ে চলা সহিংসতা দক্ষিণ এশিয়ায় সার্বিক শান্তির অন্তরায়। আফগানিস্তানের  দুর্গম দুরূহ দুস্তর ভূখণ্ড যেভাবে হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসবাদীদের স্বর্গরাজ্য, তাতে গোটা উপমহাদেশ শঙ্কিত না হয়ে পারেনা। ভারতে ক্ষমতাসীন  হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপির কাশ্মীরের বিশেষ স্বশাসন ধারা ৩৭০ তুলে দেওয়া, হিজবুল প্রধান কমান্ডার রিয়াজ নাইকু হত্যাসহ বেশ কিছু কারণে রুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান বা পাক-প্রসাশিত কাশ্মীর থেকে তাদের বাহিনী পাঠাতে পারে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে। গত জুলাই মাসে একটি ভিডিও প্রকাশ করে আল-কায়দা প্রধান আয়মান আল-জাহিরি জম্মু এবং কাশ্মীরে জিহাদী কর্মকাণ্ড বাড়ানোর বার্তা প্রকাশ করেন। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর নিশ্চিতভাবেই তালেবান আরও প্রভাব ও সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে।

আফগানিস্তানে হিংসার জোয়ার আছড়ে পড়তে পারে শুধু কাশ্মীর উপত্যকাতে নয়, উপকূলের এমনকি উপমহাদেশের যেকোন অংশে। ভারতের পুলোয়ামা থেকে ঢাকার কূটনৈতিক করিডোর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী জঙ্গি মানেই কেবল সংগঠনের আনুষ্ঠানিক শিবিরে প্রশিক্ষিত বাহিনী নয়। মেধাবী তরুণের পুঞ্জীভূত ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্ষেপকে কাজে লাগিয়ে মগজ ধোলাই করতে সামাজিক মাধ্যমে ছিপ ফেলতে পারে প্রকৌশলে বিশেষ পারদর্শী জঙ্গি সংগঠনগুলো। সার্ক নিষ্ক্রিয়-প্রায় ও সুপ্ত থাকায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এখন উচিত হবে আফগানিস্তানে শান্তি ফেরানোর জন্য দ্বিপাক্ষিকভাবে হলেও সক্রিয় হওয়া। আফগানিস্তানে সহিংসতা উপমহাদেশের কোনও দেশের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।

চয়নিকা সাক্সেনা আফগানিস্তান বিষয়ক গবেষক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং অয়নাংশ মৈত্র ভারতীয় সাংবাদিক, কূটনীতি ও গণমাধ্যম বিষয়ে গবেষক