অভিভাবকের প্রস্থান

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০     আপডেট: ২৩ মে ২০২০   

বিশ্বজিত সাহা

পিতৃসমতুল্য একজন অভিভাবকের প্রস্থান হলো। জাতি হারালো একজন শিক্ষাবিদকে। যিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

গত ১৪ মে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রাণত্যাগ করেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন ড. আনিসুজ্জামানের শরীরে করোনার উপস্থিতি ছিল। মানে করোনাভাইরাসই কেড়ে নিলো বাঙালি জাতির এই জাগ্রত মানুষটিকে।

স্যার যে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন গত ফেব্রুয়ারি তার বাসায় গিয়েই বুঝতে পারি। এরপর দেখা হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি খন্দকার রাশিদুল হক নবা ভাইয়ের দেওয়া ঢাকা ক্লাবে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। আবার দেখা হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে। কিন্তু সেই দেখাই যে শেষ দেখা হবে কখনো ভাবিনি।

স্যারের শরীর ক্রমান্বয়েই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। মার্চের শেষদিকে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর নিয়মিতই খোঁজ রেখেছিলাম। সিএমএইচে যেদিন স্থানান্তর করা হলো, সেদিন ভাবিকে (সিদ্দিকা ওহাব, মিসেস আনিসুজ্জামান) ফোন করলাম। ভাবির সঙ্গে কথা বলে এই প্রথম তার শরীর খারাপ নিয়ে একটা পোস্টও দিই। ভাবি বলেছিলেন, তাদের মেয়ে স্যারকে দেখে এসেছেন। তিনি কিছুটা ভালোর দিকে। প্রার্থনা করতে বললেন আমাদের। বললাম, ‘ভাবি, আমি কেন বাংলাভাষী সকল মানুষই স্যারের জন্য প্রার্থনা করছেন। আপনি ভালো থাকবেন।’ স্যারকে আমাদের হারাতে হলো।

ব্যক্তিগতভাবে অনেক স্নেহ, অনেক উপদেশ পেয়েছি স্যারের কাছে, বহুভাবে আমি ঋণী হয়ে থাকব। মুক্তধারার প্রতি ছিল তার নিঃশর্ত ভালোবাসা। দীর্ঘ পথযাত্রায় মুক্তধারা নিয়েও রয়েছে অনেকে স্মৃতি। বিশেষ করে ২০০৭ সালে পুরো একমাস বইমেলা উপলক্ষে তিনি ভাবিসহ আমাদের সঙ্গে আমেরিকায় কাটিয়েছেন। সে বছর ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা’ আমেরিকার ৪টি শহরে অনুষ্ঠিত হয়। নিউইয়র্কের লাগোয়ার্ডিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত বইমেলা উদ্বোধন করেন গোলাম মুরশিদ। ডালাস কনভেনশন সেন্টারের বইমেলা উদ্বোধন করেন ড. আনিসুজ্জামান। লস এঞ্জেলেস বইমেলা উদ্বোধন করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নিউজার্সির বইমেলা উদ্বোধন করেন সমরেশ মজুমদার। সেবার বইমেলায় ৪ জন উদ্বোধক ছাড়াও যোগ দিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, প্রখ্যাত জাদুশিল্পী  জুয়েল আইচ, শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য, ফেরদৌস ওয়াহিদ, হাবিব ওয়াহিদ, মাহমুদুজ্জামান বাবু, কুদ্দুছ বয়াতী, কৌশিকী চক্রবর্তী, প্রকাশক ফরিদ আহমেদ ও মহিউদ্দীন খান খোকাসহ বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন অনেক ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা।

৪টি শহরে বইমেলা, সবগুলো শহরে দু'জন করে আহ্বায়ক। নিউইয়র্কের জন্য নির্বাচন করা হয় ড. জ্যোতির্ময় দত্ত ও হাসান ফেরদৌসকে। ডালাসের জন্য নূরুল আমিন চৌধুরী ও ড. সৌরি ভট্টাচার্য, লস অ্যাঞ্জেলেসের জন্য ড. রফিকুজ্জামান ও ড. সমর সরকার ও নিউজার্সিতে ড, নূরন নবী ও আলোলিকা মুখোপাধ্যায়। প্রতিটি শহরেই একজন বাংলাদেশের ও অন্যজন পশ্চিবঙ্গের বাঙালি আহ্বায়ক ছিলেন। ভাবনা ছিল বইমেলাতে যেন দুই বাংলার বাঙালির সম্মিলন ঘটে। আহ্বায়ক যিনিই থাকুন না কেন ঐসব স্থানে বইমেলা করা সম্ভব হয়েছে সেসব স্থানে মুক্তধারার শাখা ছিল। যেমন ডালাসে সুবীর রায়, লস এঞ্জেলেসে মমিনুল হক বাচ্চু ও শংকু আইচ, নিউজার্সিতে ড. নূরন নবী, ফারুক আজমরাই ছিলেন প্রধান শক্তি।

এসব পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৬ সালের শেষের দিকে আনিসুজ্জামান স্যারকে জানালে তিনি তো অবাক। বললেন, কী বলো! এটা কী করে সম্ভব? কিভাবে করবে। টাকা আসবে কোত্থেকে? নানান সস্নেহ প্রশ্নে আমাকে বললেন, আগামীকাল ঢাকা ক্লাবে এসো। সেখানে আলোচনা হবে। ১৯৯১ সালে দেশ ছাড়ার আগে একবারই আমি ঢাকা ক্লাবে গিয়েছিলাম সাংবাদিকতায় পেশার কারণে জিনাত মোশাররফের স্বামী সচিব মোশাররফ হোসেনের সাক্ষাৎকার নিতে। আমার মনেও নেই যে স্যুট-প্যান্ট ও শু পরে যেতে হয় ঢাকা ক্লাবে। আমি প্যান্টের সঙ্গে পাঞ্জাবি ও চামড়ার স্যান্ডেল পরে ঢাকা ক্লাবে চলে গিয়েছিলাম স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। যথারীতি গেইটে আমাকে আটকে দেয়া হলো; স্যার এসে একটা জামা কিনে দিয়ে আমাকে ঢাকা ক্লাবে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করলেন। আলোচনা হলো, পুরো পরিকল্পনা স্যারকে জানালাম। স্যার বার বার বলছিলেন ২০০৫ সালে যে পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছ এবার হলে আমেরিকায় যে বইমেলাটা করতে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি স্যারকে নিশ্চিত করলাম। ঢাকার আমাদের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করত আমাদের যে বন্ধু মহিউদ্দিন খান খোকন সেও এসে পৌছালো ঢাকা ক্লাবে। জুন মাসের ২ ও ৩ তারিখ নিউইয়র্ক দিয়ে শুরু হয়ে ৯ ও ১০ জুন ডালাসে, ১৬ ও ১৭ জুন লস এঞ্জেলেসে এবং ২৩ ও ২৪ জুন নিউজার্সিতে বইমেলা অনুষ্ঠিত হবার তারিখ ঠিক হলো। মানে ৪ সপ্তাহ স্যারকে থাকতে হবে আমেরিকায়। এতদিনের জন্য স্যার তো আর একা আসতে পারেন না, সঙ্গে ভাবির আসার কথাও চূড়ান্ত করা হলো। স্যার নিজে থেকেই বললেন, তোমাদের ভাবির টিকেট খরচ দিতে হবে না। সেটা আমিই বহন করবো। মানে স্যার রাজি হলেন। আসা নিশ্চিত। চিন্তা করা যায় ড. আনিসুজ্জামান, ড. গোলাম মুরশিদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারকে আমরা পাবো নিউইয়র্ক বইমেলায়! গোলাম মুরশিদ নিউইয়র্কের বইমেলা শেষে ফিরে গেছেন লন্ডনে। আর বাকিরা সকলে ৪টি স্টেট ঘুরেছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানের মাঝে যে ৪ দিন ফাঁকা থাকতো সেই দিনগুলো ছিল অনেক মধুর। কত জায়গায় আমরা ভ্রমণ করেছি। সেই ভালো লাগার রেশ ধরেই স্যারের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেক কাছের ও নির্ভরতার জায়গায় পৌঁছায়।

২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবারই দেশে গিয়েছি ততবারই স্যার ঢাকা ক্লাবে আমাদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন। ২০১৫ সাল থেকে আমি আর যেতাম না ঢাকা ক্লাবে। বাসাতেই দেখা করতাম। স্যারের সবচেয়ে যেই গুণটি সারাজীবন মুগ্ধ হয়ে দেখেছি তা হলো, আমার মত সাধারণ মানুষদেরও আপন করে নেয়ার বিশাল ক্ষমতা। কখনো দেখিনি বিরক্ত হতে। এত বড় একজন মানুষ, নিজের বিরক্তি কখনো কাউকে বুঝতে দিতেন না। এত সুন্দর করে গুছিয়ে প্রতিটি কাজ করতেন, তা আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত। জীবনের প্রত্যেকটা কাজ কাঁটায় কাঁটায় সময়ানুর্তিতা মেনে করতেন। ১০টার সময় বললে ১০টাতেই সে কাজ তিনি করতেন। এত সুন্দর করে ডায়েরি লিখতেন, দিন, তারিখ, সময়-কিছুই বাদ যেত না। আমার বিশ্বাস স্যারের অপ্রকাশিত ডায়েরি যেই প্রকাশকই প্রকাশ করবেন তার সম্পাদনার প্রয়োজন হবে না, সব কাজই স্যার করে গেছেন। ভাবির কথা না বললেই নয়। জীবনে আমি দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি যিনি এত বড় একজন খ্যাতিমান মানুষের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার পরও অনেক গুণী এই মানুষটি নিজেকে কখনো পাদপ্রদীপের আলোয় আনতে চাননি। এটি এই যুগে বিরল।

আমেরিকায় বড় হওয়া শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা শেখার বই চূড়ান্ত করে স্যারকে দেখাই। স্যার একদিন সময় নিয়ে বললেন, এভাবে হবে না। একটা রীতি মেনে এটি লিখতে হবে। নতুবা কোমলমতি শিশুরা বিভ্রান্ত হবে। তিনি পথ দেখালেন এশিয়াটিক সোসাইটির ধ্বনিগত রীতি অনুযায়ী রচনা করতে। এরপর সেই গ্রন্থটি আহমাদ মাযহার হয়ে ভাষাবিজ্ঞানী মাহবুবুল হক এবং জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক মামুন-অর-রশীদের হাত ঘুরে বর্তমানে সেমন্তী ওয়াহেদের কাছে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বইটি হয়তো প্রকাশিত হবে, বইটি রচনায় যেমনটি করেছেন তেমনি আমাকে ও মুক্তধারাকে তিনি আরো অনেক আলোর পথ দেখিয়েছেন। আসলে তার মত মানুষতো জন্মগ্রহণই করেছিলেন অন্ধকারে আলোকবর্তিকার মত পথ দেখাবার জন্য। যেখানে অন্ধকার নেমে আসবে সেখানেই আনিসুজ্জামান স্যার সম্মুখ সারিতে দাঁড়াবেন সবসময়ের মত। যেমন তিনি তার আত্মজীবনী ‘বিপুলা পৃথিবী’র শেষ বেক্যে লিখে গেছেন—‘আমাদের পথচলা এক সময় থেমে যায়, জীবন থামে না।’ স্যার জেনে শুনেই লিখে গেছেন তার আত্মজীবনীতে জীবনের শেষ সময়ের মর্মবাণী।