দু'দিন আগেই গাঁটছড়া বাঁধেন রেজাউল করিম হৃদয়। নববধূসহ স্বজনদের নিয়ে প্রাইভেটকারে যাচ্ছিলেন রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার শ্বশুরবাড়িতে। গাড়ি চালাচ্ছিলেন হৃদয়ের বাবা রুবেল হাসান। রাজধানীর উত্তরার জসীম উদ্‌দীন সড়কে যেতেই বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ৮০ টন ওজনের গার্ডার চাপা পড়ে দুমড়েমুচড়ে যায় ওই প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো গ ২২-৬০০৮)। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পাঁচজন। আহত হলেও বেঁচে যান নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়া মনি। গতকাল সোমবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ঘটে এই মর্মন্তুদ ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্রেনে বক্সগার্ডার তোলার সময় সেটি চলন্ত গাড়িতে আছড়ে পড়ার পরই ক্রেনের কর্মীরা পালিয়ে যান। বিধ্বস্ত গাড়ির ভেতর তখনও চলছিল বাঁচার আকুতি। প্রকল্পের লোকজন আর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলেও গাড়ির ওপর থেকে ভারী গার্ডার সরাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ঘটনার অন্তত তিন ঘণ্টা পর আরেকটি ক্রেন এনে গার্ডার সরানো হয়। ততক্ষণে চিড়েচ্যাপ্টা গাড়িতে আটকে থাকা নিস্তেজ পাঁচজন ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যান। এরপর উদ্ধার কর্মীরা শুধু পাঁচজনের লাশই বের করে আনতে পারেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছিলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে গাড়িতে আটকে পড়া পাঁচজনকে উদ্ধার করা গেলে অন্তত এক শিশুকে হয়তো বাঁচানো যেত। কারণ দীর্ঘ সময় ভেতর থেকে এক শিশুর কান্না ভেসে আসছিল। অনেক চেষ্টা করেও কেউ সহায়তা করতে পারছিলেন না।

নিহতরা হলেন রুবেল হাসান (৬০), হৃদয়ের শাশুড়ি ফাহিমা খাতুন (৪০), ফাহিমার বোন ঝরনা আক্তার (২৮) এবং ঝরনার দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়া (২)। নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়াকে উদ্ধার করে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
উত্তরার এই হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন তিনি।

ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিনুল্লাহ নূরী। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতারকে প্রধান করে করা ওই কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে ভারী গার্ডার বসাতে গিয়ে এত বড় দুর্ঘটনার পর শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। উদ্ধার তৎপরতায় দেরি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা কথা।

হৃদয়ের খালাতো ভাই রাকিব হোসেন জানান, গত শনিবারই হৃদয়-রিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্ত্রীসহ স্বজনদের নিয়ে আশুলিয়ায় শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন হৃদয়। পথেই ঘটল এমন মর্মস্পর্শী ঘটনা।

রাকিব বলেন, 'বিয়েবাড়ির আনন্দ উৎসব এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যেই পুরো পরিবারে বিভীষিকা নেমে এসেছে। কিছু বলারও ভাষা নেই আমাদের।'

স্বজনরা জানান, হৃদয়ের বাড়ি মেহেরপুর, শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের ইসলামপুরে। খিলক্ষেতের কাওলা এলাকা থেকে তাঁরা সবাই আশুলিয়া যাচ্ছিলেন।

যেভাবে ভয়াবহ দুর্ঘটনা :ঘটনার পর ক্রেনের অপারেটরসহ দায়িত্বরতরা পালিয়ে যাওয়ায় ওই সময় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি। 'যান্ত্রিক ত্রুটির' কারণে ক্রেনটি 'ভারসাম্য হারিয়ে' কাত হয়ে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিআরটি সংশ্নিষ্টরা।
অবশ্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিআরটি প্রকল্পে উত্তরা উড়াল সড়ক হচ্ছে চলমান সড়কের মাঝ বরাবর। আর প্রাইভেটকারটি যাচ্ছিল রাস্তার একপাশ দিয়ে। গার্ডার তোলার সময় এক পাশে কাত হয়ে যায় সেটি। গার্ডারটি একপাশে কাত হয়ে প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। তখন পেছনে একটি মাইক্রোবাসসহ আরও কয়েকটি গাড়ি ছিল। সেগুলো থেমে যাওয়ায় রক্ষা হয়। দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় যানজট দেখা দিলে বিমানবন্দর সড়কে যাতায়াতকারীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান বলেন, দুর্ঘটনার সময় ক্রেনটি ঘুরে ঠিক উল্টো দিকে প্রাইভেটকারের ওপর আছড়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, স্লিপ কেটে ভারসাম্য হারিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গেছে এটি।
বিআরটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, 'কারিগরি ত্রুটির কারণে ক্রেনটি একদিকে হেলে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্রেন দিয়ে আরও গার্ডার তোলা হয়েছে। তার মানে গার্ডারের ওজন তোলার ক্ষমতা ওই ক্রেনের আছে। কোনো কারিগরি ভুলের কারণে ক্রেনটি কাত হয়েছে। ক্রেনটি চলে চেইনের ওপর, চেইন থেকে স্লিপ করতে পারে।'

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন জানান, বক্সগার্ডার ওঠানোর সময় ভারসাম্য রাখতে না পারায় বহনকারী ক্রেন একদিকে কাত হয়ে যায় বলে তারা শুনেছেন।

ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওই সময়ে লেন ধরে অনেক গাড়ি যাচ্ছিল। দুর্ঘটনায় পড়া গাড়িটির আগে একটি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও কয়েকটি প্রাইভেটকার যায়। এরপর দুর্ঘটনায় পড়া প্রাইভেটকারটি আসে। ঠিক এর পেছনেই অনাবিল পরিবহনের একটি বাস ছিল।
এদিকে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে এমন ভারী কাজ করার সমালোচনার বিষয়ে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিনুল্লাহ নূরী বলেন, 'গার্ডার তোলার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কিনা, তা ছাড়া যে ক্রেন দিয়ে গার্ডারটি তোলা হয়েছে, সেটির সক্ষমতা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।' গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সচিব আরও বলেন, দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দু'জনের চিকিৎসার খরচ আমরা বহন করব।

অবশ্য বিআরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, যেখানে কাজ করা হয়, সেখানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। তবে গার্ডারটি নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে গিয়ে পড়েছে।

উদ্ধার তৎপরতায় কেন দেরি :প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বিকেল সোয়া ৪টার দিকে প্রাইভেটকারের ওপর গার্ডারটি পড়ে। তবে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার হয় সন্ধ্যা সোয়া ৭টায়। এর আগে স্থানীয়দের সহায়তায় হৃদয় ও রিয়াকে বের করা হয়। দুই শিশুসহ পাঁচজনের নিথর দেহ দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়িতেই থাকে। শুরুর দিকে প্রকল্পের লোকজন গ্রিল কাটার মেশিন দিয়ে গাড়ি কেটে ওই পাঁচজনকে বের করার চেষ্টা করেন। তাতে ব্যর্থ হন তাঁরা। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে আরেকটি ভারী ক্রেন এনে সরানো হয় আছড়ে পড়া গার্ডারটি। এরপর বের করা হয় পাঁচজনের লাশ।

ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বলছেন, লোকজনের ভিড়ে তাঁদের উদ্ধার তৎপরতায় বেগ পেতে হয়েছে। তা ছাড়া ওই গার্ডার সরানোর মতো ভারী যন্ত্রও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের কাছে ছিল না। এ জন্য উদ্ধার কার্যক্রমে সময় লেগেছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন জানান, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে প্রকল্পের কাউকেই তাঁরা পাননি। বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের কোনো ধরনের সহায়তা পুলিশ পায়নি। এ জন্য শুরুর দিকে তাঁরা উদ্ধার কাজে গতি আনতে পারেননি।
প্রাইভেটকারের ওপর থেকে গার্ডার সরাতে দেরির বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, এত বড় গার্ডার সরানোর সক্ষমতা ফায়ার সার্ভিসের নেই। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন আসার পর গার্ডারটি সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁদের আসতে সময় লাগায় দেরি হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক শাহজাহান শিকদার জানিয়েছেন, লাশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকায় তিনটি বিআরটি এবং তিনটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। সেই অনুযায়ী, ২০১২ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার বিআরটি-৩ লাইন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে কাজ শুরুই হয় ২০১৭ সালে। বিআরটির নির্মাণকাজ মারাত্মক ভোগাচ্ছে দেশের ব্যস্ততম সড়ক টঙ্গী-জয়দেবপুরের যাত্রীদের। এ পথে দিনে গড়ে ৬০ হাজার গাড়ি চলে। যানজট নিরসনে সরকারের সচিবদের পর্যন্ত নির্মাণ এলাকায় যেতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে।

তিন দফায় দুই বছর করে সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগামী ডিসেম্বরেও কাজ শেষ হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।