কোরবানি ঈদ ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছে একের পর এক চাঁদাবাজির অভিযোগ। বিশেষ করে পশুবাহী ট্রাক চাঁদাবাজির মুখে পড়ছে বেশি। কোথাও কোথাও ব্যাপারীরা ডাকাতদের কবলে পড়ছেন। পশুবাহী ট্রাকে পথে পথে চাঁদাবাজি নিয়ে গতকাল সমকাল বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রেক্ষাপটে ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজদের রুখতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, 'হয় এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, নইলে দায়িত্ব ছেড়ে ঢাকায় চলে আসতে হবে।' গতকালের সমকালের প্রধান প্রতিবেদনটি দেখিয়ে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল এলাকায় পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, গণমাধ্যমে চাঁদাবাজির ব্যাপারে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কেন তাঁদের কাছে আগাম তথ্য থাকে না? পুলিশ ব্যবস্থা নিলে ওই এলাকায় চাঁদাবাজদের সক্রিয় থাকার কথা নয়। চাঁদাবাজদের পরিচয় যা-ই হোক, এখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা করতে না পারলে পদ হারাবেন সংশ্নিষ্ট জেলার এসপিরা। আইজিপি আরও বলেন, মানুষের কল্যাণ নিশ্চিতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ঈদের আগে পুলিশের রুদ্ধদ্বার অপরাধ পর্যালোচনা সভার শেষ দিন ছিল গতকাল বুধবার। পুলিশপ্রধানের সভাপতিত্বে এতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সব রেঞ্জের ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও সংস্থাটির সব ইউনিটের প্রধানরা এতে অংশ নেন।

পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, পশুবাহী কোনো ট্রাক ও পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান থামানো যাবে না। কোরবানির পশু পরিবহনে রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না।
এ ছাড়া ঈদ ঘিরে যে কোনো ধরনের নাশকতার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যাতে কেউ অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকার কথা বলা হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যাতে কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, তা দেখভালে সাইবার টহল বাড়াতে হবে। এমনকি অর্থ-সংক্রান্ত জালিয়াতি দিন দিন বাড়ছে বলে মত দেন অনেকে। অর্থ পাচার প্রতিরোধে পুলিশকেও আরও তীক্ষষ্ট নজর রাখতে বলা হয়েছে ওই সভায়।

পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনার শেষ দিনে পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে পথে পথে চাঁদাবাজির বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় আইজিপি বেনজীর আহমেদ এমন ঘটনায় সংশ্নিষ্ট এসপিদের প্রতি উষ্ফ্মা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, যথাযথভাবে এসপিদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আইজিপি বলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোরবানির পশুবাহী যানবাহন থামানো বা চেক করা যাবে না। পশুর হাটে পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেন তিনি। ঈদ সামনে রেখে শপিংমল, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা; বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনের নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও বন্যাকবলিত এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশ মিলনায়তনে ওই সভা শুরু হয়। এতে গেল তিন মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণসহ নানা অপরাধ নিয়ে বিশ্নেষণ করা হয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ দমনে নানা দিকনির্দেশনা দেন আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ডাকাতির মামলা নিয়ে আলোচনার সময়ে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ডাকাতি বেড়েছে। তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ বিষয়ে আইজিপি বলেন, ডাকাতি হলেও অনেক ক্ষেত্রে মামলা না নেওয়ার কথা শোনা যায়। কেউ ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে এলে তা মামলা আকারে নিতে হবে। এ ধরনের মামলা হলে ডাকাত সদস্যরা গ্রেপ্তার হবে, তাতে ডাকাতিও কমে আসবে।

সভায় অংশ নেওয়া ডিআইজি ও এসপি মর্যাদার একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সম্প্রতি ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তৎপরতা বেড়েছে বলে সভায় আলোচনা হয়। সংগঠনটি যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেদিকে সবাইকে নজর দিতে বলা হয়।

সভা সূত্র জানায়, গত ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ীতে আওয়ামী লীগের জনসভা মঞ্চের সামনে তৈরি কৃত্রিম পুকুর সাঁতরে এক তরুণী প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি চলে যান। এ নিয়েও সভাতে আলোচনা হয়। ওই তরুণী নিরাপত্তা চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে সেখানে চলে গেলেন, নিরাপত্তা দুর্বলতা ছিল কিনা, কারও গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা আলোচিত মামলা এবং এর তদন্ত নিয়েও আলোচনা করেন। চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো তদন্তে বিলম্বের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। কিছু মামলার তদন্ত মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সেখানে পুলিশপ্রধান বলেন, মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে তদারকি বাড়াতে হবে। দ্রুততম সময়ে তদন্তকাজ শেষ করতে হবে। নিবিড় তদারকির মাধ্যমে মামলা তদন্তের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

আইজিপি বলেন, মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হবে। মহাসড়কে করিমন, নছিমন, ভটভটি যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। দূরবর্তী স্থানে মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালনের জন্য তিনি নির্দেশনা দেন।
সভার প্রথম দিন অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) এ ওয়াই এম বেলালুর রহমান এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ সামগ্রিক অপরাধ চিত্র তুলে ধরেন। দ্বিতীয় দিন গতকাল পুলিশের সব ইউনিটের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রেজেন্টেশন দেন টেলিকম অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট (টিঅ্যান্ডআইএম) ইউনিটের ডিআইজি এ কে এম শহীদুর রহমান।