প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আসতে চাই না। জনগণের ভোট ছাড়াও ক্ষমতায় আসতে চাই না। নির্বাচন করেই ক্ষমতায় আসতে চাই। আমার ক্ষমতার লক্ষ্যই হচ্ছে- মানুষের কল্যাণ করা। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। অত সহজে হারতে রাজি নই।' পদ্মা সেতুকে দেশের অহংকার ও গর্ব বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের শক্তিমত্তা নতুনভাবে চেনাতে পেরেছে। দেশবাসীর সাহসেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। সব ষড়যন্ত্র-প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। আমি মানুষের শক্তিতে বিশ্বাস করি। মানুষের কাছ থেকে যে সাহস ও সহযোগিতা পেয়েছি, সেটাই বড় শক্তি।

গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কারও চাপের মুখে কখনও নতিস্বীকার করেনি, করবেও না। আমাদের যে আত্মবিশ্বাস রয়েছে, তা নিয়েই চলব। জনগণের শক্তি নিয়েই আমরা চলব। দৃঢ়কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঝড়-তুফান, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস আসবেই। সেটিকে মোকাবিলা করেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অকল্পনীয় বন্যা হয়েছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকার জনসাধারণকে আশ্বাস দিতে চাই, সরকার তাদের পাশে রয়েছে। মানুষের ভোগান্তি লাঘবে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের যাতে কোনো সমস্যা না হয়- সেই ব্যবস্থাও সরকার করবে।

করোনা সংকট চলার দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে এলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেখানে ২৫ জুন বহুলপ্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এবং সিলেট-সুনামগঞ্জসহ সারাদেশের বন্যা পরিস্থিতিসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘদিন পর সাংবাদিকরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। প্রধানমন্ত্রীও স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে খোলামেলা জবাব দেন। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা কাদের নিয়ে নির্বাচন করবে? তাদের নেতা কে? এই দলের নেত্রী (খালেদা জিয়া) দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত। সরকারপ্রধানের নির্বাহী ক্ষমতায় সাজা মওকুফের সুযোগ দিয়ে তাঁকে বাসায় থাকার সুযোগ আমিই করে দিয়েছি। এই দলের আরেকজন (তারেক রহমান) তো দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে রিফিউজি হয়ে রয়েছেন। লন্ডনের নাগরিকত্ব নিতে তিনি যে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছেন, তার উৎস কী? আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি দলকে নির্বাচন করতে হলে নেতা দেখাতে হয়। বিএনপির তো দেখানোর মতো কোনো নেতা নেই। আরেকটি দলের (জাতীয় পার্টি) তো কোনো সাংগঠনিক ভিত্তিই নেই। বাম দলগুলো ভাঙতে ভাঙতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকার ধারণ করেছে। কোথায় কোন বক্তব্যে দাঁড়ি হবে না, সেমিকোলন হবে- সেটা নিয়ে বিরোধ করেও তারা ভাঙছে। এখানে গণতন্ত্রের দোষ কোথায়? ঠিক আছে, একটা শক্তিশালী দল গড়ে দেন, মাঠেই দেখা হবে।

'সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হইনি' :প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ধরনের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসা যায়। কিন্তু আমি কোনো সুযোগ নিইনি। সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হইনি। যেনতেনভাবে প্রধানমন্ত্রী হওয়া লক্ষ্যও ছিল না।

বিভিন্ন সময় তাঁকে ক্ষমতার লোভ দেখানো হলেও তিনি নতিস্বীকার করেননি বলে জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল নির্বাচন না করলে আমাকে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, ১৯৫৪ সালে তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী ছিলেন। তখনই আমরা মন্ত্রীর বাসায় থেকেছি। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর লোভ আমাকে দেখাবেন না। আমি নির্বাচন করতে চাই। নির্বাচন করেই ক্ষমতায় আসতে চাই। পরে সেটাই হয়েছে।

'তারা কী মানবাধিকার শেখাবে?' :বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা আমাদের কী মানবাধিকার শেখাবে? মানবাধিকার শেখাতে আসবে কারা, যারা খুনিদের আশ্রয় দেয়! আর যেদেশে প্রতিনিয়ত স্কুলে গুলি হয়ে ছাত্রছাত্রী মারা যায়, রাস্তাঘাটে পুলিশ গলায় পাড়িয়ে মেরে ফেলে- তাদের কাছ থেকে মানবাধিকার শিখতে হবে?'

'পদ্মা সেতুকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে':পদ্মা সেতু ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক গড়ে উঠবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ওই অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। পদ্মার দু'পারে পর্যটন শিল্পেরও ব্যাপক প্রসার ঘটবে। দক্ষিণাঞ্চলে দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জায়গা খোঁজা হচ্ছে। এই সেতু চালু হওয়ার পর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এক দশমিক দুই-তিন শতাংশ হারে অবদান রাখবে এবং প্রতি বছর দশমিক আট-চার শতাংশ হারে দারিদ্র্য নিরসন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের গুণগত মানে আপস করা হয়নি।
'বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ, তাদের কারণেই নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু' :দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমি বরং বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তাদের ঋণ বন্ধ হয়েছিল বলেই আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পেরেছি। তিনি বলেন, ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করা হয়। এরপর শুরু হয় ষড়যন্ত্র। একটা কথা আছে, 'নিজের ভার ভালো না, গোয়ালার ঘি'র দোষ দিয়ে লাভ কী?' পদ্মা সেতুর ঋণটা আসলে কেন বন্ধ হয়েছিল? আমাদের ঘরের (দেশের) কিছু লোকের জন্যই কিন্তু এটা বন্ধ হয়েছিল।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি ব্যাংকের এমডি একটি ফাউন্ডেশনে (হিলারি ক্লিনটনের ফাউন্ডেশন) এতো বিপুল অঙ্কের ডলার অনুমোদন দিলেন কীভাবে? এত টাকা কোথা থেকে পেলেন তিনি? ড. ইউনূসের মাধ্যমে ছয় কোটি টাকা একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে চলে গেছে বলে সরকারের কাছে তথ্য আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাস্টের টাকা একটি প্রাইভেট ব্যাংকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে চলে যায় কীভাবে? আপনারা সাংবাদিকরা এসব খুঁজে বের করুন। তদন্ত শুরু করুন, পরে এ ব্যাপারে যদি সহায়তা লাগে দেব। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে সরকারপ্রধান বলেন, সেটা সময়ই বলে দেবে। বিশ্বব্যাংকসহ পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা তাদের বিবেকের বিষয়। এ বিষয়ে আমরা কিছু বলব না।

'সিলেটে অকল্পনীয় বন্যা হয়েছে' :সিলেট অঞ্চলের বন্যার ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিলেটে অকল্পনীয় বন্যা হয়েছে। বন্যার পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে গ্রাম, শহর, নগর ও সড়ক-মহাসড়ক প্লাবিত করেছে। এবারের বন্যা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম। বিগত একশ-সোয়াশ' বছরের মধ্যে এমন প্রলয়ঙ্করী বন্যা ওই এলাকায় হয়নি। বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, সরকারেরও নেই। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি কমানো এবং দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো সরকার সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কিনা, সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

'এখনই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নয়, আগে প্রথমটার টাকা উঠুক' :দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে সেখান থেকে রিটার্ন কী আসবে তা দেখতে হবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু আমার মাথায় আছে, যেটা হয়তো করা হতে পারে। তিনি বলেন, কেবলই এতবড় সেতু করে (পদ্মা সেতু) এত টাকা খরচ করেছি। আরেকটা এখনই শুরু করতে পারব না। আগে প্রথমটার খরচের টাকা উঠুক, তারপর ওটা ভেবে দেখা যাবে।

অন্যান্য প্রসঙ্গ :আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ এই উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন দল। এদেশের মাটিতেই এই দলের জন্ম। প্রতিপক্ষ যে দলগুলো আছে, সেগুলোর জন্ম কোথায়? বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান একাধারে সেনাপ্রধান ও পরে বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে নিজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন। এরপরই তিনি সেনানিবাস থেকে এ গাছের ছাল আর ও গাছের বাকল দিয়ে বিএনপির জন্ম দিয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির জন্মও একইভাবে। যে দলগুলো তৃণমূল থেকে উঠে আসেনি, তাদের কাছ থেকে কী আশা করা যায়?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান করোনাভাইরাস মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত গোটা বিশ্বকেই একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। সরকার চেষ্টা করছে, অর্থনীতির চাকা সচল রেখে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে। এই সময়ে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে, অপচয় বন্ধ করতে হবে।