অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে চিকিৎসা করাতে যশোর শহরের বেসরকারি পঙ্গু হাসপাতালে আসেন ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান শেখ (৬৫)। ওষুধের বিল মেটাতে মায়ের কেবিন থেকে বৃহস্পতিবার বেরোনোর পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। দু’দিন পর শনিবার দুপুরে ওই হাসপাতালের লিফটের নিচে বেজমেন্টে মিললো তার রক্তাক্ত মরদেহ। পুলিশের ধারণা, তাকে হত্যা করে মরদেহ সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়।

মফিজুর রহমানের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরের আড়পাড়ায়। তিনি গাড়ির ব্যবসা করতেন। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে তিনি নিখোঁজ হন। ওইদিন হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা বন্ধ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ পঙ্গু হাসপাতালের ম্যানেজার আতিয়ার রহমান, লিফটম্যান জাহিদ গাজী ও আব্দুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। এ ছাড়া র্যা ব আরও চারজনকে হেফাজতে নিয়েছে।

মফিজুরের ছেলে শেখ সোয়েব উদ্দীন জানান, তার দাদী আছিয়া বেগম পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে গত সোমবার যশোর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রতিদিনই মাকে দেখতে হাসপাতালে আসতেন মফিজুর রহমান। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তিনি মাকে দেখে হাসপাতালের ওষুধের বিল মেটানোর জন্য নিচে নামেন। এরপর থেকে তার আর খোঁজ মিলছিল না। ওই রাতেই যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সোয়েব। এ ছাড়া বিষয়টি র‌্যাবকেও জানানো হয়। দু’দিন পর আজ হাসপাতাল থেকে জানানো হয় হাসপাতালের পার্কিং গ্রাউন্ডে লিফটের কাছ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এরপর পুলিশ গিয়ে গলিত একটি মরদেহ উদ্ধার করে।

এর আগে নিখোঁজের ঘটনায় ছেলে শেখ সোয়েব জিডিতে উল্লেখ করেন, তার দাদি আছিয়া বেগম (৯০) পঙ্গু হাসপাতালের সপ্তম তলায় ভর্তি আছেন। গত বৃহস্পতিবার তার বাবা মফিজুর রহমান পঙ্গু হাসপাতালে যান। তিনি দাদির কাছে তার বাবাকে বসিয়ে রেখে নিচে যান প্রয়োজনীয় কাজে। কিছু সময় পর তার বাবা ওই রুম থেকে বের হন। এরপর দুপুর ২টার দিকে তিনি গিয়ে দেখেন তার বাবা সেখানে নেই। অনেক সময় পার হলেও তার কোনো দেখা মেলেনি। তিনি তার বাবার মোবাইল নম্বরে কল করেন। কিন্তু ফোন রিসিভ হয়নি। পরে রাতে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাধ্য হয়ে বাবার খোঁজে তিনি কোতোয়ালি থানায় একটি জিডি করেন।

যশোর কোতোয়ালি থানাধীন চাঁচড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক এস এম আকিকুল ইসলাম জানান, শনিবার দুপুর ১টার দিকে তারা খবর পান হাসপাতালের নিচতলায় লিফটের নিচে একটি মরদেহ পড়ে আছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে হাসপাতালে অবস্থানরত মফিজুর রহমানের স্বজনদের খবর দিলে তারা মরদেহ শনাক্ত করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে কোতোয়ালি থানার পুলিশসহ র‌্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তারা আসেন। এ ঘটনায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ও দুই লিফটম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন হাসপাতালের সিসি ক্যামেরাগুলো অচল থাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আকিকুল ইসলাম আরও জানান, মরদেহ যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হবে। তবে পুলিশের একাধিক টিম রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে। এ ছাড়া র‌্যাব, পিবিআই ও অন্যান্য সংস্থাও ছায়াতদন্ত করছে।

নিহতের স্বজন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম দাবি করেন, মফিজুরকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। এই খুনের সঙ্গে হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা বন্ধেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে তারা সন্দেহ করছেন।

নিহতের আরেক স্বজন শেখ সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, নিখোঁজের পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তার ফুপার সন্ধানে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি তারা। বরং বলছে, নিখোঁজের একদিন আগে থেকে তাদের হাসপাতালের সিসিটিভির হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জড়িত আছেন বলে সন্দেহ তাদের।

তবে পঙ্গু হাসপাতালের মালিক যশোর মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এএইচএম আব্দুর রউফ ওইদিনই সিসি ক্যামেরা অচল হওয়াকে অঘটন উল্লেখ করে বলেন, হার্ডডিস্ক ত্রুটির কারণে ক্যামেরা বন্ধ ছিল। বিষয়টি জানার পর টেকনিশিয়ান এসে ত্রুটিমুক্ত করেন। 

তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি কিভাবে মারা গেছেন তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। আর পুরো ঘটনাটি প্রশাসনের তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে সব কিছু জানা যাবে।