রাজধানীর আবদুল্লাহপুরের স্লুইসগেট এলাকা। রাস্তার ধারে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল লোকজন। একটু এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে এলো যুগলবন্দি গান। আরও কাছে গিয়ে দেখা গেল গান গাইছেন বাউল সামসু ও দুঃখী মাজেদা। কেউ কেউ গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন ১০-২০ টাকার নোট।

'দুঃখী মাজেদা' নামেই চেনে সবাই লোকশিল্পী মাজেদাকে। যদিও দুঃখী মাজেদার কণ্ঠের গান খানিকক্ষণের মধ্যেই সুখী করে তোলে মানুষকে। ৭ বছর বয়সে যখন গান গাওয়া শুরু করেন, তখন থেকেই তার নাম হয়ে ওঠে দুঃখী মাজেদা। ওই বয়সে বাড়ি থেকে বলতে গেলে চুরি হয়ে যান তিনি। শুরু হয় দুঃখী জীবনের। তখন তিনি থাকতেন মুন্সীগঞ্জ। গৃহকর্মীর কাজও করেছেন বহুদিন। কিন্তু করোনা এসে কেড়ে নিয়েছে তার সে কাজ। এখন লোকগান গেয়ে মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যে বেঁচে আছেন।

যশোরের কেশবপুরে জন্ম মাজেদার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমি যখন এটুক (ইশারায় শৈশব বোঝান), তখন দোকানপাড়ায় যেখানে-সেখানে গান গাইতাম। মানুষজন শুনে (খুশি হয়ে) আমাকে বিস্কুট দিত, চানাচুর দিত। তখন ঠিকমতো গাইতে পারতাম না। যেমন 'শিশুকাল ছিল ভালো'কে গাইতাম 'ছিলাম ভালো, ছিলাম ভালো'। শিশুকাল বলতে পারতাম না, ছোট ছিলাম তো...।"

মাজেদা বলেন, 'যখন ৭ বছর বয়স, তখন আমাকে একটা মানুষ চুরি কইরা নিয়া আইসা পড়লো। লোকটার বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। থাকত বিক্রমপুরে (মুন্সীগঞ্জ)। কাশেম কোম্পানি, বিশাল কোম্পানির লোক সালাউদ্দিন। ১০ বছর ছিলাম তার বাসায়। অনেক কষ্ট করছি জীবনে।' বলতে বলতে মাজেদার গলা ভারি হয়ে আসে। 'ঢেঁকিতে সারাদিন কয়লা পাড়াইছি, রান্না করছি, সিমেন্টের বস্তা মাথায় নিয়া ওপরে উঠছি। সে আমারে দুইটা পয়সা বেতন দেয় নাই; অনেক খাটছি।'

সালাউদ্দিন ছিলেন অনেক প্রভাবশালী। মাজেদা জানান, তার পিস্তল আছে, দেখছি। বন্ধুদের নিয়ে আসত, তারা মদ খেত, আর আমাকে মাঝে বসিয়ে গান গাওয়াত। তখন তার বন্ধুরা অনেক টাকা দিত। আমি একটা টাকাও পাইতাম না। আশপাশের লোকজন আমাকে বলত, তুমি চলে যাও। ও অনেক খারাপ; মদ খায়, গাঁজা খায়। তুমি কোনো টাকা পাবা না। আমি ভাবিকেও (সালাউদ্দিনের স্ত্রী) এসব কথা বলেছি।

এভাবে থাকতে থাকতে একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে মাজেদার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার সঙ্গে মুন্সীগঞ্জ থেকে পালিয়ে যান। মাজেদার কথায়- 'সালাউদ্দিনের ওখানে প্রায় ১০ বছর খাটার পর ১৬ বছর বয়সে আমি এক ছেলের হাত ধরে পালিয়ে আসি। কিন্তু সেই ছেলে আমারে থুইয়া আরেকটা বিয়া করছে। তাই তার পিছ ছাইড়া দিছি। এর পর থিকা বাড়িতে বাড়িতে কাম কইরা চলে আমার একলা জীবন। ওস্তাদের দেখা পাইলাম। সুখ-দুঃখের জীবন নিয়াই আমি ওস্তাদের সঙ্গে আছি।' এসব কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মাজেদা। 'আমার আর কিছু বলার নাই' বলেই লুটিয়ে পড়েন ওস্তাদ সামসুর পায়ে।

গৃহকর্মী থাকার সময়েই গানের চর্চা শুরু করেন মাজেদা বাউল সামসুর কাছ থেকে। তার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে শিল্পী হয়ে ওঠেন মাজেদা। অভাব দূর করতে বাউল সামসুকে নিয়ে শুরু করেন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাউল, ভাওয়াইয়াসহ নানা ধরনের লোকগান গাওয়া। দুঃখী জীবনের কষ্টকে জড়িয়ে নেন নিজের নামের সঙ্গে। হয়ে ওঠেন 'দুঃখী মাজেদা'। এখন এ নামেই সবার কাছে পরিচিত তিনি। সামসু জানান, ২০১০ সালের দিকে মাজেদা তার কাছে গান শেখার জন্য আসে। তখন সে গৃহকর্মীর কাজ করার ফাঁকে গানের তালিম নিত। কয়েক দিন যাওয়ার পর তার গানের গলা মোটামুটি আয়ত্তে চলে আসে। তখন তিনি গান গেয়ে কিছু টাকা পেলে এর একটি অংশ পেতেন মাজেদাও। এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে গৃহকর্মীর কাজটি চলে যায় তার।

গৃহকর্মী থাকা অবস্থায় কী কাজ করতেন, জানতে চাইলে মাজেদা বলেন, ওই বাসায় বাবুর্চির কাজ করতেন। বার্গার, শিঙ্গাড়া, সমুচা, শিক কাবাব থেকে শুরু করে ভারতীয় খাবারদাবারের মধ্যে ইডলি, সাম্বার, দোসাসহ অনেক খাবার বানাতে পারেন।

যে ম্যাডামের বাসায় কাজ করতেন, তিনিই উদ্যোগ নিয়ে এসব রান্না শিখিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। সে ম্যাডাম দেশের বাইরে চলে গেলে বাড়ি বাড়ি 'ছুটা' কাজ শুরু করেন মাজেদা। কিন্তু করোনাকালে মহাবিপাকে পড়েন। তার ভাষায়, 'তখন ঘর ভাড়া দিতে পারি না, ঠিকমতো খাইতে পারি না। ওস্তাদও চলে গেছে বাড়ি। ঘরে একটা নাতি, তারেও খাওয়াতে পারি না। নাতিটারে কোলে লইয়া রাস্তায় দাঁড়াইয়া থাকি। কারও কাছে যে হাত পাতমু, সেইটাও পারি না। পরে এক সাহেব আমারে প্রতিদিন দাঁড়াইয়া থাকতে দেইখা এক হাজার টাকা দিছিল। সেইটা দিয়া বাজার কইরা খাইছি।'

করোনাকালের সময়টা কেটেছে খুব কষ্টে। মাজেদা জানান, এক দিন এক দোকানদারের অনুরোধে প্রথমবারের মতো রাস্তার পাশে গান করেন তিনি। তখন একজন খুশি হয়ে তাকে এক হাজার দুইশ টাকা দেন। এভাবেই শুরু হয় তার গান গেয়ে টাকা পাওয়া। এর পর থেকে প্রতিদিন কখনও তিনশ-চারশ, কখনও বা পাঁচশ টাকা পেতেন গান গেয়ে। মাঝে মাঝে সামসুও এসে যুক্ত হতেন, তবে বেশিদিন থাকতেন না। প্রথমদিকে সামসু রাস্তায় গান গাইতে সংকোচ করলেও পরে সেটি ধীরে ধীরে কেটে যায়।

গান গাওয়ার সময় মাজেদা সব সময় একটা গোল টুপি পরে থাকেন। বলেন, 'আগে মাথায় পাগড়ি বাঁধতাম। পরে উত্তরার দিকে এক দিন গান গাওয়ার সময় এক ম্যাডাম এসে আমারে আর ওস্তাদরে টুপি দিয়া কইলেন, টুপিটা তুমি পইরো। বাইরে বাইর হইলে রোদ লাগে, তাই সব সময় টুপিটা পরে থাকি।'

এখন গান গেয়ে মোটামুটি দিন চলে যায় মাজেদার। যদিও আগের তুলনায় আয়-রোজগার কমে গেছে। সকাল শুরু হয় নাতির সঙ্গে খুনসুটি করে। সেই নাতি এখনই ঢোল বাজিয়ে গান গায়। বলতে বলতে আবার মাজেদা অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। ভবিষ্যতে নিজের গানের একটি অ্যালবাম বের করতে চান মাজেদা। তিনি চান, কেউ বাড়িয়ে দিক সাহায্যের হাত তার দিকে। যে হাত ধরে তিনি উঠে আসবেন লোকচক্ষুর অন্তরাল থেকে। পৌঁছে যাবেন শ্রোতাসাধারণের কাছে।

বিষয় : জীবন যুদ্ধ বাউল মাজেদা

মন্তব্য করুন