জরিমানার ভয়

বিআরটিএতে উপচেপড়া ভিড়

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইন। এতে জরিমানা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর এ কারণে বৈধ কাগজপত্র পেতে বিআরটিএতে ভিড় করছেন যানবাহন মালিকরা। রোববারের ছবি- মাহবুব হোসেন নবীন

গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করতে উপচেপড়া ভিড় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকার তিন সার্কেল কার্যালয়ে। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ছিল সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ।

গত শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। এই আইনে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা বেড়েছে হাজার গুণ পর্যন্ত। ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা ফিটনেস সনদ না থাকলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে নতুন আইনে। হতে পারে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড। আগে এ অপরাধের জরিমানা ছিল ৫০০ টাকা। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন না থাকলে জরিমানা দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। গাড়ির ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ না থাকলে জরিমানা ১০ হাজার টাকা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাত দিন নতুন আইনে মামলা করা হবে না। এরপর কঠোর হবে সরকার। সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা বৃদ্ধির আলোচনায় মুখর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। হঠাৎ জরিমানা বৃদ্ধিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে-  এমন আলোচনাও রয়েছে। তবে চালক ও মালিকরা যে জরিমানার ভয়ে রয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়েছে আইন কার্যকরের পর প্রথম কর্মদিবসে। গতকাল সকাল ১১টার দিকে মিরপুরে দেখা যায়, গাড়ির দীর্ঘ সারি। বিআরটিএ প্রাঙ্গণে জনসমাবেশের মতো ভিড়। মিরপুর কার্যালয়ে ব্র্যাক ব্যাংক শাখায় টাকা জমা নেওয়া হয়। সেখানের সাতটি কাউন্টারের সবক'টিতে ছিল দীর্ঘ সারি।

সেখানে কথা হয় লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে আসা আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, মোটরসাইকেল আছে তার; কিন্তু লাইসেন্স করা হয়নি। নতুন আইনে জরিমানা ২৫ হাজার টাকা। এত টাকা জরিমানা তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই লাইসেন্স করতে এসেছেন।

মিরপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল আলম সরকার সমকালকে বলেছেন, গতকাল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল সেবাগ্রহীতার সংখ্যা। তিনি জানান, লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন- এই চার সেবার জন্য বেশি ভিড় বেড়েছে। মালিকানা পরিবর্তনের আবেদনও বেড়েছে। অনেকের লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন কার্ড আগে প্রিন্ট হলেও নিতে আসেননি। এখন তারাও আসছেন। যারা কাগজপত্র হারিয়েছেন, তারাও ভিড় করছেন।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকেও খোলা ছিল মিরপুর সার্কেল। সারাদিনে কোন খাতে কতজন সেবাগ্রহীতা আসেন, তা তখনও জানাতে পারেননি শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, স্বাভাবিক সময়ে সারাদিনে পাঁচ হাজার সেবাগ্রহীতা আসেন। গতকাল এসেছেন অন্তত দশ হাজার। সেবা দিতে হিমশিম দশা।

বিএরটিএ কর্মকর্তারা জানান, নতুন জরিমানার হার নিয়ে ভয়ে আছেন চালক ও মালিকরা। তাই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন কাগজ হালনাগাদ করতে। গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনে ধরপাকড় শুরুর পরও এমন ভিড় হয়েছিল। সে বার ভিড় সামলাতে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখা হতো বিআরটিএর সার্কেল কার্যালয়গুলো। শনিবারও অফিস খোলা রাখা হয় টানা এক মাস।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান কামরুল আহসান সমকালকে বলেন, সব সার্কেলেই চাপ বেড়েছে। সন্ধ্যার পর অফিস খোলা রয়েছে। তবে বাড়তি সময় কাজ করতে এখনও অফিসিয়াল আদেশ জারি করা হয়নি। প্রয়োজন হলে করা হবে।

বিআরটিএর ইকুরিয়া সার্কেলের সহকারী পরিচালক সুব্রত কুমার দেবনাথ জানিয়েছেন, সেখানেও চাপ বেড়েছে। বেশি চাপ ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদে। বেড়েছে চালকের শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদন।

মিরপুর সার্কেলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে মিরপুরে দিনে গড়ে ছয় থেকে সাতশ' গাড়ি আসত ফিটনেস সনদ নিতে। গতকাল প্রায় তিন গুণ এসেছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনও ২০০ থেকে বেড়ে পাঁচশ' ছাড়িয়েছে। তবে জনবল সংকটে সেবা দিতে গলদঘর্ম হচ্ছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা।

বিআরটিএর সবচেয়ে ব্যস্ত সার্কেল মিরপুরে মোটরযান পরিদর্শক পদ রয়েছে ১৯টি। তাদের ১০ জন গাড়ির ফিটনেস যাচাই করেন। দিনে দেড় হাজার ফিটনেস দিতে হলে জনপ্রতি দেড়শ' গাড়ি দেখতে হয়। যা কোনোভাবে সম্ভব নয়। একজন মোটরযান পরিদর্শক সমকালকে বলেছেন, একটি গাড়ির ফিটনেস যাচাইয়ে আড়াই থেকে তিন মিনিট সময় পাওয়া যায়। কিন্তু একটি গাড়ি ভালোভাবে দেখতে আধা ঘণ্টা সময় দরকার। তাই গাড়ি চোখের দেখায় কিংবা না দেখেই সনদ দিতে হচ্ছে।

ভিড়ের সুযোগ নিচ্ছে দালালরা। সরেজমিন দেখা গেল, দ্রুত কাজ করিয়ে দিতে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে দরদাম করছেন কয়েক যুবক। তাদের একজনের নাম ফয়সাল। তিনি জানান, মোটরসাইকেলের দুই বছরের নিবন্ধন ফি ১২ হাজার ৭৩ টাকা। ১৫ হাজার টাকা দিলে এক ঘণ্টার মধ্যেই নিবন্ধন করিয়ে দেবেন। লাইনে দাঁড়াতে হবে না। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কেটে পড়ে ওই যুবক।