সম্রাট আছেন 'সম্রাটের' মতোই

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আতাউর রহমান

রাজধানীর কাকরাইলে রাজমনি সিনেমা হলের ঠিক উল্টোপাশে আটতলা ভবন। লোকজন এই ভবনটিকে চেনেন 'সম্রাটের' অফিস হিসেবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ব্যক্তিগত অফিস এটি। গত বুধবারের আগেও এই অফিস ঘিরে নেতাকর্মীর ভিড় লেগে ছিল। এখনও কিছুটা আছে। অনুসারী-নেতাকর্মীর ভিড়ের সঙ্গে ভবনের সামনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আর গণমাধ্যমকর্মীদেরও আনাগোনা বেড়েছে। সম্রাটের অনুসারীদের চোখেমুখে হতাশা আর আতঙ্কের ছাপ। তবে ওই ভবনে সম্রাট রয়েছেন 'সম্রাটের' মতোই। বুধবার মধ্যরাত থেকে গতকাল শুক্রবার রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত টানা ৪৪ ঘণ্টা ধরে তিনি এই ভবন থেকে বের হননি। অনুসারীরা রীতিমতো ভবনটি ঘিরে একপ্রকার পাহারা বসিয়েছে।

দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি কেন কার্যালয় থেকে বের হচ্ছেন না? কেন তার কার্যালয় ঘিরে পাহারা- তা নিয়ে গত তিন দিনে নানা কথা ডালাপালা ছড়িয়েছে। একই ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে। কতিপয় যুবলীগ নেতার ক্যাসিনো 'সাম্রাজ্যে' আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হানার পর কানাঘুষা শুরু হয়েছে- গ্রেফতার হচ্ছেন সম্রাটও। এ জন্যই তিনি নিজের কার্যালয়ে কর্মীদের নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। এমনও কথা শোনা যাচ্ছে যে, ভেঙে দেওয়া হচ্ছে দক্ষিণ যুবলীগের কমিটি।

পুরো বিষয়ে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও ভবনের নিরাপত্তা কর্মীরা ভেতরে ঢুকতে দেননি। পরে তার মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি জানান, তার শরীর ভালো নয়। এ জন্য খুব একটা বের হচ্ছেন না। তাছাড়া দলীয় কর্মসূচি না থাকায় তিনি বের হচ্ছেন না।

গ্রেফতার এড়াতে কার্যালয় থেকে বের হচ্ছেন না- এ অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, এটা ঠিক নয়। সব সময়েই তিনি ওই ভবনে থাকেন। এটা নতুন কিছু নয়। পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বলেন, 'আমি বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। সেই চেষ্টা করছি।'

ভবনেই রান্না, ভবনেই ঘুমান তিনি :বুধবার সন্ধ্যায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর মধ্যরাতে অনুসারীদের নিয়ে কাকরাইলের ওই ভবনে কর্মীবেষ্টিত হয়ে আছেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। তখন নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন- 'সম্রাটের কিছু হলে/জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে', 'সম্রাট ভাই ভয় নাই/রাজপথ ছাড়ি নাই'। এরপর থেকে ভবনের ভেতর-বাইরে প্রায় হাজার খানেক নেতাকর্মী নিয়ে তিনি নিজের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। অনুসারীদের দিয়ে নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে সেখানে।

গতকাল শুক্রবার সকালে ও দুপুরে দুই দফায় এই প্রতিবেদক ভবনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে ভেতর থেকে কলাপসিবল গেট আটকানো দেখা যায়। ভেতর থেকে নিরাপত্তাকর্মী জানান, আপাতত ভেতরে কাউকে প্রবেশের অনুমতি নেই। ওই সময়ে বাইরে থেকে চার থেকে পাঁচজন যুবক ঘিরে ধরেন এই প্রতিবেদককে। ভেতরে ঢুকতে চাওয়ার কারণ জানতে চান। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে নিজেদের যুবলীগের কর্মী পরিচয় দিলেও নাম না বলেই চলে যান।

অবশ্য সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভবনটির চারতলায় নিজের কক্ষেই সম্রাট অবস্থান করছেন। সেখানেই তিনি ঘুমান। তার ঘুমের সময় ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং বিশ্বস্ত অনুসারী মিলিয়ে ২০ জন তাকে রাতভর পাহারা দেন। ভেতরেই সবার জন্য রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানেই তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন। প্রতিদিন অন্তত ৩০০ কর্মীর জন্য ওই ভবনে রান্নার আয়োজনও হয়।

ওই সূত্রটি জানায়, ভবনটির নিচতলায় 'যুব জাগরণ' নামে একটি পাঠাগার রয়েছে। সেখানে বসে যে কেউ যুবলীগের বিভিন্ন প্রকাশনার বই পড়তে পারেন, বই বিক্রিও হয় সেখান থেকে। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সেটি বন্ধ রয়েছে। নিচতলার একটি অংশে মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের অফিস রয়েছে। সেখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিলেও গত দু'দিনে কেউ আসেননি। ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা খালি থাকে। সেখানে বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীরা অবস্থান করেন। চতুর্থতলায় সম্রাটের অফিস ও বিশ্রামের জায়গা রয়েছে। উপরের তলাগুলোতে অডিটরিয়াম রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সময়ে যুবলীগের নানা সভা হয়।

যুবলীগের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, চতুর্থতলাতে সম্রাটের জন্য আলিশান থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরো ভবনটি আগে থেকেই নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে ছিল। সম্প্রতি সেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ঘনিষ্ঠ কর্মীদের তিনি জানিয়েছেন, বুধবারের পর থেকে তিনি কিছুটা বিমর্ষ ও চিন্তিত। নিয়মিত ঘুমাতেও পারছেন না। এমন অবস্থার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।

বিদেশ যাওয়ার চেষ্টায় সম্রাট :যুবলীগের মধ্যে এমন কথাও ছড়িয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানের মুখে গ্রেফতার এড়াতে সম্রাট বিদেশ চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অবশ্য তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, সম্রাটের হার্টে পেসমেকার বসানো রয়েছে। এ জন্য তিনি মাঝেমধ্যেই বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা করান। শিগগির বিদেশ যাওয়ার কথা ছিল। তার জরুরি চিকিৎসারও দরকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি বিদেশ গেলে পালিয়েছেন বলে দুর্নাম রটবে। এ জন্য তিনি যাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সমকালকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি পেলে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন। এ জন্য তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন।