'ইটস অ্যা বয়'

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাশেদ মেহেদী

'সাধ' অনুষ্ঠানে স্ত্রী মালিহা মাহফুজ অন্যার সঙ্গে এই ছবিটি তুলেছিলেন নাফিস ইমতিয়াজ- ফেসবুক থেকে

মালিহা না ফেরার দেশে চলে গেছেন পহেলা আগস্ট রাতেই। চলে গেছে তার স্বপ্নও। মাতৃত্বের স্ম্ফুরণে উদ্ভাসিত হয়ে যে আলোর সিঁড়ি তিনি সাজিয়েছিলেন, সেই আলো আর নেই। অবিকল অন্ধকার। অথচ কয়দিন আগে অনাগত অতিথির আগমনী বার্তা জানিয়েছিলেন, করেছিলেন সাধ আর সাধ্যের এক নিগূঢ় অনুষ্ঠান। সেখানে তোলা ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে স্বামী নাফিস ইমতিয়াজ অনেক আনন্দ নিয়ে লিখেছিলেন, 'ইটস অ্যা বয়'। অনেকে অনেক শুভকামনা জানিয়েছিলেন সেখানে। মালিহা-নাফিসের হাস্যোজ্জ্বল ওই ফটোগ্রাফগুলো এখন স্মৃতির অ্যালবাম, ধূসর ছবির বেদনার্ত এক আয়োজন। ২ আগস্ট থেকে তা পরিণত  হয়েছে শোকগাথা এক নিথর বইয়ে।

মাত্র দু'মাস পরেই এই দম্পতির মাঝখানে অফুরন্ত আনন্দ আর শান্তির বার্তা নিয়ে আসত এক নতুন শিশু। মালিহা নেই, তাই শিশুটিও আর আসবে না কোনোদিন। অব্যক্ত বেদনা আর কষ্টমুখর এই ভার কি বহন করা যায় সহজে!

মালিহার মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই তিনি পহেলা আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হার মানেন ডেঙ্গুর কাছে। গত ২১ জুলাই জ্বর শুরু হয় তার, ২২ জুলাই ভর্তি হন উত্তরার লুভানা হাসপাতালে। আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য আসেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানে দু'দিন থাকার পর অবনতি হয় তার অবস্থার। সব শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সপ্তাহখানেক চিকিৎসাধীন থাকার পর চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তার যুগল যাত্রা- তিনি আর তার অনাগত একজনের।

মাত্র ২৭ বছর বয়সের মালিহা বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছিলেন, কর্মরত ছিলেন মেঘনা নিট কম্পোজিট লিমিটেডে। বিয়ে হয়েছিল আঠারোর ২০ জুনে। স্বামী নাফিস ইমতিয়াজ পেশায় প্রকৌশলী। কর্মরত আছেন 'সিঙ্গুলারিটি' নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। মালিহার মামা ডা. কামাল আব্দুল ওয়াহাব বলেন, 'ওর বয়স যখন তিন বছর, তখন বাবা মারা যান ওর। বড় বোন ফারিহা আর ওকে বড় করেন তার মা আসমাউল হুসনা সাথী। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে মালিহা সত্যিই অনেক বড় হয়েছিলেন। আরও বড় হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন এভাবে থেমে যাবে, কে জানত!

মালিহার দাফন হয়েছে গত শুক্রবার, গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ধনবাড়িতে।

'নিজের কাছে আমার প্রতিশ্রুতি, যতটুকু পেয়েছি, ততটুকু নিয়েই সুখী হবো। যা পাইনি বা হতে পারিনি, তা নিয়ে এখনই চিন্তা করা বন্ধ করব।' ফেসবুক টাইমলাইনে কথাগুলো ইংরেজিতে লেখা ছিল এভাবে- 'অ্যা প্রমিজ টু মাইসেলফ টু বি হ্যাপি অ্যান্ড থ্যাঙ্কফুল ফর হোয়াট আই হ্যাভ (স্টপ থিঙ্কিং অ্যাবাউট হোয়াট আই ক্যান'ট)।' এই ফেসবুক টাইমলাইনটি মালিহা মাহফুজ অন্যার। একদিন আগে এই টাইমলাইনেই তার নামের ওপর যোগ হয়েছে 'রিমেমবারিং' বা 'স্মরণ করছি' শব্দটি।

আব্দুল্লাহ আল কেমি মালিহার একজন বন্ধু। তিনি বলেন, 'মালিহা খুবই সম্ভাবনাময় একজন ফ্যাশন ডিজাইনার ছিলেন। হাসিখুশি সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। বন্ধুদের কাছে ছিলেন খুবই প্রিয়। বন্ধুরা কোনোভাবেই তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। তাদের কান্নাভেজা স্ট্যাটাসে এখন ভারী হয়ে উঠেছে মাহিলার রিমেমবারিং টাইমলাইন।'

মালিহার বন্ধু অন্তুমা চক্রবর্তী লিখেছেন, 'মালিহা, আমরা তোমাকে সব সময় খুব মিস করব... আর কিছু বলার মতো শব্দ পাচ্ছি না।'

আর এক বন্ধু মাইশা আফরিন লিখেছেন, 'আপু, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।'

মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্বামীর পরিবারের সঙ্গে উত্তরায় থাকতেন মালিহা। নাফিসের মায়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসে নববধূ সাজে মালিহা এবং নাফিসসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এক পারিবারিক ছবি, তাতে লেখা- 'আমার পরিবার'। এই পরিবারে আর মাত্র দুই মাস পরেই যোগ হতো নতুন আর এক সদস্য। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল বোধহীন এক মশার কামড়ে!

বিষয় : ডেঙ্গু মালিহা না ফেরার দেশে