কে বুঝবে মাহফুজার কষ্ট

হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে-স্বামী বাসায় কাঁদছে আরেক সন্তান

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাজিদা ইসলাম পারুল

স্বামী ও শিশু সন্তান দু'জনই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। পরিচর্যায় হিমশিম খাচ্ছেন স্ত্রী। হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে শুক্রবার তোলা ছবি: সমকাল

হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত সাত মাস বয়সী সন্তান রিধান পারভেজকে সুস্থ করে তুলতে যুদ্ধ করে চলছেন মাহফুজা নাসরীন। পাশের আরেক ওয়ার্ডে একই রোগ নিয়ে ভর্তি তার স্বামী আনোয়ার পারভেজ। একদিকে স্বামী ও শিশুসন্তানকে সুস্থ করার যুদ্ধ, অন্যদিকে মমতাময়ী মায়ের মন পড়ে আছে বাসায় থাকা সাত বছর বয়সী মেয়ে নাভিন শেহরীশের কাছে।

মাহফুজা বারবার এই ভেবে কষ্ট পাচ্ছেন যে, বাড়িতে থাকা তার সন্তান দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারছে কি-না। মা-বাবা আর ছোট ভাইকে না দেখতে পেরে প্রায়ই ছটফট করে সে। মোবাইল ফোনে বাবা-মায়ের কাছে ছোট্ট মেয়ের আকুতি, 'মা কবে বাসায় ফিরবা?' কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকেও হাসপাতালে আনা যাচ্ছে না। এ যে অনেক কষ্টের।

কথাগুলো বলতে গিয়েই বারবার চোখে পানি চলে আসে ময়মনসিংহের গৌরীপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাহফুজার। তিনি সমকালকে বলেন, 'একজন মা-ই বুঝতে পারেন, এই সময়ে তার ভেতরে কী অনুভূতি হয়!' ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শিশুসন্তান ও স্বামীকে নিয়ে তার উদ্বেগ বাড়ায় গণমাধ্যমের খবর। প্রতিদিনই ছাপা হয় ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মৃত্যুর খবর। তাই স্বামী-সন্তানের সুস্থতার জন্য দিনরাত একাকার করে ফেলছেন তিনি।

রাজধানীর ইস্কাটনের হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এসএম ৩৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের ২/১১ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে মাহফুজার শিশুপুত্র রিধান। পাশের ওয়ার্ডের ৩/১১ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তার স্বামী আনোয়ার। তিনি কলাবাগান প্রিমিয়ার ব্যাংক শাখার ডেপুটি ম্যানেজার।

মাহফুজা জানান, সিদ্ধেশ্বরীর ৭৯ নম্বর বাড়িতে থাকেন তারা। গত ২৬ জুলাই দুপুরে ছেলের জ্বর আসে। রাতের মধ্যেই তার শিশুপুত্রের গায়ে র‌্যাশ (লাল দাগ) দেখা যায়। দেরি না করে, পরের দিন সকালেই বেইলি রোডের মনোয়ারা হাসপাতালে পরীক্ষা করান। এতে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত হলে সন্ধ্যার মধ্যেই আশপাশের তিন থেকে চারটি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেন। কিন্তু শয্যা না পাওয়ায় মাহফুজার ছোট বোনের স্বামীর চেষ্টায় হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি শয্যা পাওয়া যায়। তবে এখানে কেবিন পাওয়া দুস্কর। এরপর ২৮ জুলাই দুপুর থেকেই আনোয়ার পেটে ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন। সঙ্গে হালকা জ্বর। পরে তারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

এক সপ্তাহ ধরে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে এই হাসপাতালে দিন-রাত কাটাচ্ছেন মাহফুজা। সঙ্গে আছেন মাহফুজার মা। ওষুধপথ্য, স্বামী ও ছেলের রক্ত পরীক্ষা করানো, পরীক্ষার ফল সংগ্রহ করা, বাইরে থেকে খাবার কিনে আনা– সবকিছুই নিজ হাতে সামলাচ্ছেন মাহফুজা। তার মা রিধানকে যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন।

ওয়ার্ডের নোংরা শৌচাগারের কারণে গত এক সপ্তাহে একদিন (বৃহস্পতিবার) গোসল করেছেন তিনি। শান্তির ঘুম এখন স্বপ্নের মতো মনে হয় মাহফুজার কাছে। দিনে-রাতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান তিনি।

মাহফুজার মেয়ে নাভিন পড়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড শাখার তৃতীয় শ্রেণিতে। এখন থাকছে নানার তত্ত্বাবধানে। তবে বয়সের ভারে নিজেই ন্যুব্জ মাহফুজার বাবা। নাভিন বাবা-মায়ের কাছে ফেরার আকুতি জানায় প্রতিদিন।

মাহফুজা সমকালকে বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। এ রোগে মৃত্যুতে আতঙ্ক বেড়েছে। তাই শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি মাহফুজাকে এই আতঙ্কও অনেকটা দুর্বল করে ফেলছে। আনোয়ার পারভেজ বলেন, স্বামী-স্ত্রী দু'জনই চাকরিজীবী হওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

বিষয় : ডেঙ্গু জ্বর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ডেঙ্গু রোগী