সমকাল-কোস্ট ট্রাস্ট গোলটেবিল আলোচনা

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে শুধু প্রত্যাবাসন নয়, বিকল্পও ভাবুন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

শুধু প্রত্যাবাসনের কথা না ভেবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিকল্প ভাবনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সমকাল ও কোস্ট ট্রাস্টের আয়োজনে 'রোহিঙ্গাদের মানবিক মর্যাদা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত' শীর্ষক যৌথ গোলটেবিল আলোচনায় তারা এ অভিমত তুলে ধরেন। প্রত্যাবাসনের বিকল্প হিসেবে রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন তারা। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের সামনে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তুলে ধরার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি এবং কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী যৌথভাবে এ গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন। বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, রিফিউজি, রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব আবুল কালাম, ইউএনএইচসিআরের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টিভেন করলিস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের শিক্ষক ব্যারিস্টার মনজুর হাসান, উন্নয়ন কর্মী শিরিন হক, অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নাইম ওয়ারা, বৈশাখী টেলিভিশনের পরামর্শক (বার্তা বিভাগ) ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি জুলফিকার আলী মানিক, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী, কক্সবাজারের ইন্টার সেক্টরাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের সৈকত বিশ্বাস এবং জাগো নারী উন্নয়ন সংস্থার শিউলি শর্মা। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্যাম্পেইন অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহকারী পরিচালক মুজিবুল হক মুনির।

স্বাগত বক্তব্যে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু সরকার নয়, সবাই মিলে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মানবিক ভাবমূর্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'মাদার অব হিউম্যানিটি' খেতাবও পেয়েছেন। এখন আগত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা ও মর্যাদা যদি না দেওয়া যায়, তা হলে দায়িত্ব পালন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এক্ষেত্রে আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক নীতিনির্ধারণী সহায়তা হিসেবে কাজে আসবে।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্র হিসেবে সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশেই নিজেদের কাজ শেষ করে না, সামাজিক ইস্যুতেও ভূমিকা রাখে। এরই অংশ হিসেবে এ আয়োজন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের শিক্ষক ব্যারিস্টার মনজুর হাসান বলেন, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশই তরুণ। এদের ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনতে পারলে বড় সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। কীভাবে তাদের কর্মসংস্থান হবে সেটা চিন্তা করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপরে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছে, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকটি নারকীয় বর্বরতার একটি। শুধু ধর্ম, ভাষা এবং জাতিগত পরিচয়ের 'অপরাধে' রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তা যে কোনো বিবেচনাতেই ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ।

তিনি বলেন, যত সমালোচনাই হোক, বাংলাদেশ সরকার বিপন্ন রোহিঙ্গাদের জরুরি মানবিক আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে এ দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশকে বিশ্ব এখন মানবিক দেশ হিসেবে চিনছে। এ জন্য অবশ্যই বর্তমান সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনবিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এবং তাদের সম্পর্কে জনমনে যেসব ধারণা প্রচলিত আছে, সেসবের সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য অনেক। রোহিঙ্গাদের অনেক পরিবার এসেছে, যাদের সব পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে, শুধু নারী সদস্যরা বেঁচে আছেন। এমন অনেক শিশু আছে, যাদের বাবা-মাসহ অন্য কোনো অভিভাবক বেঁচে নেই। মানবতার ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় এই রোহিঙ্গা ক্যাম্প। আবার উখিয়ার জনসংখ্যাই যেখানে আড়াই লাখ, সেখানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসে নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে এলাকার জনমিতির মানচিত্রই আমূল বদলে গেছে। এর চাপ কতটা ভয়াবহ, এর ভবিষ্যৎ কতটা বিপদ সংকেতময়- তা বোঝা জরুরি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এসে অপরাধ করছে, এ ধারণাও পুরো ঠিক নয়। কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় আগে থেকেই ইয়াবা আসত। প্রধান চোরাকারবারিরা সবাই বাংলাদেশি। এখন কোনো কোনো রোহিঙ্গা তাদের বাহক হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, এ জন্যই রোহিঙ্গাদের কর্মহীন রাখা যাবে না। কর্মহীন থাকলে তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি স্টিভেন করলিস বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে ভয়ঙ্কর বর্বরতা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিশ্ব সচেতন। বাংলাদেশ তাদের রক্ষায় মানবিকতার যে নজির স্থাপন করেছে, তাও বিশ্ববাসীর জানা। তবে এ সংকটের ভবিষ্যৎ বিপদের দিক সবার উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, এ সংকট মিয়ানমার তৈরি করেছে। তারা রোহিঙ্গাদের অপরাধী বলেছে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধের বিচার করেনি। বরং তাদের ওপর গণনিষ্ঠুরতা ও অত্যাচার চালিয়েছে।

স্টিভেন করলিস বলেন, যারা অপরাধ করে সুনির্দিষ্টভাবে তাদেরই বিচার হয়, এটাই নিয়ম। কিন্তু মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্যাতন চালিয়েছে। এ সংকট সমাধানে বিশ্বকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

উন্নয়নকর্মী শিরিন হক বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য তৈরি করা শিক্ষাকেন্দ্র অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি চিন্তার ফল। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাকেন্দ্র চালু করতে হবে। যাতে সব বয়সের শিশু যথার্থ শিক্ষা পায়। তিনি বলেন, কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ভূমিকায় যাওয়া উচিত হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুপক্ষীয় তৎপরতা বেশি কার্যকর হতো। অবশ্য এখনও সে সময় ফুরিয়ে যায়নি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবাইকে পুনর্বাসন করার জন্য এ রকম ১০-১৫টি ভাসানচর প্রয়োজন। এ সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি-না, তা এক বড় প্রশ্ন। তাই রোহিঙ্গাদের অন্যান্য দেশে স্থানান্তরের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে কীভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়, তা ভাবতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নাইম ওয়ারা বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেক নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিকূল পরিবেশে রোহিঙ্গা নারীসহ অন্যরা যেভাবে মানিয়ে নিয়েছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, সব রোহিঙ্গা ফিরে যাবে না- এটাই বাস্তবতা। এখন তাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা ভাবতে হবে। তৃতীয় দেশে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের ওপর তিনিও জোর দেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার কখনোই ফিরিয়ে নেবে না। যারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলছেন, তাদের এই ১০ লাখ লোককে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। অর্থাৎ তৃতীয় কোনো দেশে রোহিঙ্গাদের পাঠাতে উদ্যোগী হতে হবে।

রোহিঙ্গাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া মডেল সামনে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

সৈকত বিশ্বাস বলেন, রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য চলতি বছর 'গ্লোবাল জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের' অংশ হিসেবে ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২২ ভাগ পাওয়া গেছে। সামনে আরও আসবে। এ জন্য দাতাদের কাছে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দেন তিনি।

শিউলি শর্মা বলেন, রোহিঙ্গা আসার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। কীভাবে সম্প্রীতি বাড়ানো যায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।