'সর্ব শাসত্রানাং বোধাদপি গরীয়সী।' যারা আবৃত্তি করেন তারা এ কথাটি বেশিরভাগ লেখায় দেখে থাকবেন। কথাটি দিয়ে আবৃত্তিকাররা বোঝাতে চাইছেন, শাস্ত্রের মধ্যে আবৃত্তিশাস্ত্র প্রধান। কবিতা যেন দিগন্তে ছুটে চলা এক মহাসত্য। যার কোনো স্থান-কালের সীমা নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবৃত্তি চর্চা ও বোধের জগতের মহাসত্যের উন্মোচন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে 'ধ্বনি'।

বিকেল হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ধ্বনি কক্ষে জড়ো হন বাচিকশিল্পীরা। কেউবা কণ্ঠশীলন করেন, কেউ শুদ্ধ উচ্চারণ চর্চা করেন, কেউবা কণ্ঠের মাধুরী মিশিয়ে নির্মাণ করেন একেকটি কবিতা। ধ্বনির সদস্যরাই এখানে শিক্ষক। খুব সযত্নে অগ্রজরা তাঁদের স্নেহের অনুজদের আবৃত্তিশাস্ত্রের দীক্ষা দেন। এ যেন প্রাচীন যুগের এক পাঠশালা। গুরুর একান্ত স্নেহধন্য হয়ে শিষ্যরা শিখছেন সুন্দর বাচনভঙ্গি আর শুভ্রবোধের চর্চা। কণ্ঠশীলনের মাঝেই ধূমায়িত চায়ের কাপে আলোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে তা ছুটে চলে দেশ-দেশান্তরে। তাদের আলোচনায় সংস্কৃতি আর সাহিত্য যেমন থাকে, তেমনি থাকে সমসাময়িক রাজনীতি কিংবা সমাজের বিদ্যমান কোনো অসংগতি। ধ্বনি এভাবেই তার সদস্যদের শেখায় আত্মমর্যাদাবান হতে; সব অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে; প্রচলিত সমাজকে ভেঙে শুভ্র-সুন্দর চেতনার সুন্দর এক সমাজ গড়ে তুলতে।

নতুন সদস্যদের বরণ করে নেয় খুব আপন করেই। ধ্বনি কক্ষে কেউ একবার প্রবেশ করলে পরিবারের মতো আগলে রাখে। টিএসসির ৯নং কক্ষে নিয়মিত বসে কবিতা অনুশীলন। শুধু কবিতা অনুশীলন তো আর হয় না; সেসঙ্গে চলে গল্প-আড্ডা-গান।

ধ্বনি সদস্যরা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পরিবেশনা করেন। আবৃত্তির কবিতার মোহে আচ্ছন্ন করে রাখেন সবাইকে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পয়লা বৈশাখের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিভিন্ন আয়োজনে তাঁরা অংশ নেন। একক, দ্বৈত কিংবা দলগত আবৃত্তি পরিবেশনায় মুগ্ধ করেন দর্শক-শ্রোতাকে। মুক্তমঞ্চে ধ্বনির আবৃত্তি শুনতে সারি বেঁধে বসে যান দর্শকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুগ্ধ হয়ে কবিতা শোনেন।

শুধু আবৃত্তি পরিবেশনাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি যৌক্তিক আন্দোলনেই ধ্বনি থাকে সবার সামনের সারিতে। ধ্বনির বর্তমান সভাপতি সামি আল জাহিদ প্রীতম বলেন, ক্যাম্পাসে সংস্কৃতি অঙ্গনে ধ্বনি সবসময় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রতি মাসে 'জ্বালো ঐতিহ্যের আলো' এবং বার্ষিক কর্মশালা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা নবীনদের আবৃত্তির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেষ্টা করি। আবৃত্তির এই শুভ্রবোধের চর্চা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ূক- এই কামনাই করি।

কবিতা আমাদের সচেতন করে। বোধের জাগরণ ঘটিয়ে আহ্বান করে সত্যের। কবিতা এভাবেই সমাজ গড়ে, দেশ গড়ে, গড়ে ভালোবাসাময় এক শুভ্র-সুন্দর জগৎ। বোধের জাগরণ ঘটিয়ে ধ্বনি ছুটে চলুক দিগন্তের পানে; সূর্যের মতো মহাসত্যের আলোকপ্রভা ছড়িয়ে পড়ূক সর্বত্র।

বিষয় : কবিতা অনুশীলন মননশীলতার চর্চা

মন্তব্য করুন