চারদিকে থৈ থৈ পানি। কোথাও মরদেহ দাফন করার শুকনো জায়গাটুকুও নেই। বাধ্য হয়ে মায়ের মরদেহ কলার ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছেন ছেলে। কিন্তু দাফন তো হতে হবে মায়ের মরদেহ। তাই মরদেহের সঙ্গে তিনি চিরকুট লিখে দেন। তাতে লেখা- 'শুকনো জায়গায় কবর দিও মাকে'। গত রোববার বন্যাদুর্গত সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে বলে জানান হাওর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি কাশমির রেজা। ভেলায় মরদেহ ভাসিয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যরা নীরবে চোখের জল ফেলেন।

তাঁদের আশা- কোনো সহৃদয় ব্যক্তি মরদেহ পাওয়ার পর দাফনের ব্যবস্থা করবেন।

এদিকে মরদেহ ভাসিয়ে দেওয়ার আরও একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ। তিনি বলেন, নয় নগর গ্রামের রেনু মিয়ার ছেলে রাব্বুল আলামিন (২) বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। শুকনো জায়গায় কবর দিতে না পেরে মা-বাবা পানিতে তাঁদের ছেলের মরদেহ ভাসিয়ে দেন।

কাশমির রেজা সমকালকে বলেন, রোববার সকালে আমরা আজহারী সাইবার টিমের সঙ্গে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর এলাকার টাঙ্গুয়ার হাওরে সারাদিন ঘুরে ত্রাণ বিতরণ ও বন্যার চিত্র পরিদর্শন করি। আমাদের নৌকা বিশ্বম্ভরপুর হাওরের ভাতের টেক আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মর্মান্তিক সেই দৃশ্য চোখে পড়ে। আত্মীয়স্বজন কলার ভেলায় করে মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। সেই মরদেহের সঙ্গে একটি চিরকুট দেওয়া হয়েছে। তাতে মায়ের মরদেহ দাফনের জন্য ছেলে আকুতি জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, হাওরে অমানবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মানুষ দাঁড়ানোর মতো এক ইঞ্চি শুকনো জায়গাও নেই। এর মধ্যে দুর্গত অনেক এলাকায় এখনও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি।

হাওর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি আরও জানান, মধ্যনগর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, শাল্লা এলাকা খুবই দুর্গত। ওইসব এলাকায় যাতায়াত খুবই কষ্টকর; তাই লোকজন সেখানে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন না। আর একশ্রেণির নৌকার মাঝিরা সিন্ডিকেট করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা এক হাজার টাকার জায়গায় ১০ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণসহ নৌকার মাঝিদের নৈরাজ্য দূর করতে প্রশাসনের তদারকি বৃদ্ধি করা জরুরি।


বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাবিউর রহিম জাকির বলেন, আমার উপজেলার ৯০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এখানে কবরস্থানগুলো তলিয়ে গেছে। লাশ দাফনে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হচ্ছে- এটাই স্বাভাবিক।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, আমার এলাকায় সবক'টি ইউনিয়ন ও গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কবরস্থানগুলো তলিয়ে গেছে। লাশ দাফন না করে ভাসিয়ে দেওয়ার তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।