মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। আমাদের হতাশার কারণ হলো, বহু বছর ধরেই দেশে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে আসছে। তা ছাড়া বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত গৃহীত কোনো ব্যবস্থাই এসব ঠেকাতে পুরোপুরি সক্ষম হচ্ছে না। এর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা।

কারণ একটা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁদের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগে প্রশ্ন জেনে উত্তর মুখস্থ করা এবং এমনকি আলোচ্য ক্ষেত্রে যেমনটা করা হয়েছে- ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা হলে বসেই অন্যের সহায়তায় গোটা উত্তরপত্র প্রস্তুতকারী চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগ পাওয়ার ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অদক্ষ ও অমেধাবী কর্মীতে ভরে যায়। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ও জনগণ উপযুক্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। ওই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আমাদের বিস্মিত না হওয়ার কারণ হলো, এখানে যে পদ্ধতিতে বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণ হয়ে থাকে, তাতে কোনো একটা পর্যায় থেকে প্রশ্ন ফাঁস হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যে এত ফাঁক থাকে যে, দক্ষতম কাউকে দায়িত্ব দিলেও ওই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত অনেক আলোচনা হলেও নীতিনির্ধারকরা তা কানে তুলেছেন বলে মনে হয় না।

মাউশির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছেন, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। তাঁদের পরিকল্পনায় পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র নির্বাচিত ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়; প্রশ্নপত্র ফাঁস করার পর কে কীভাবে লাভবান হবেন, আগে থেকেই একাধিক বৈঠকে তার ছক কষা হয়। এ জন্য একশর মতো পরীক্ষার্থী বাছাই করা হয়, যাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার কথা ছিল।

এ বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলার সময় মাউশির একজন পরিচালক ও নিয়োগ নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক বলেছেন, 'প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের কাজটি মাউশি একাই করেছে। মুদ্রণের সময় প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ধারণা করছি, কেন্দ্রে বিতরণের সময় কেউ ফাঁস করেছে।' তদন্তকারী পুলিশ ও নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক- উভয়ের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের লোকদের সহায়তা ছাড়া এ দুস্কর্ম করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর আগেও একাধিক পাবলিক পরীক্ষা বা সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার অভিযানের ফল হিসেবে একই চিত্র বের হয়ে এসেছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ঘটনাতেই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। তা ছাড়া বারবার শুধু চুনোপুঁটিরাই ধরা পড়ে; রাঘববোয়ালরা আড়ালেই থেকে যায়। এর একটা কারণ অবশ্য হতে পারে, এ ধরনের প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই দেখা গেছে অপরাধ সংঘটনকারী ও হোতাদের কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। তবে এ অবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ঘৃণ্য অপরাধীরা যে তাদের  অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দ্বিগুণ উৎসাহ পায়, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না।

যা হোক, আমাদের প্রত্যাশা, এবার আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হবে। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মাউশির প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করা। এ পদক্ষেপটা ওই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত দু'জন বিসিএস কর্মকর্তাকে ছাড় দেওয়ার চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছে, তা ভুল প্রমাণ করার জন্যও প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমস্যাটির মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- এটাও আমাদের বিশ্বাস।

বিষয় : মাউশির প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পাদকীয় মাউশি

মন্তব্য করুন