২০২০ সালের অক্টোবর। রাজধানীর শেওড়াপাড়ার একটি বাড়ির নিচতলায় হঠাৎ পানির পাইপলাইনে সমস্যা দেখা দিল। মিস্ত্রিকে ডেকে আনলেন ভাড়াটিয়া। তখন স্টোররুমের ফলস ছাদ খোঁড়াখুঁড়ির পর হঠাৎ বেরিয়ে এলো আস্ত মানব কঙ্কাল।

এ ঘটনার পর পুলিশ এসে সেখান থেকে উদ্ধার করে কঙ্কালটি। কঙ্কাল জব্দের এই মামলা থানা পুলিশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত গেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির কাছে। চাঞ্চল্যকর মামলা বিবেচনায় একটি টিম গঠন করে এখনও এটির তদন্ত করছে সিআইডি। কিন্তু কঙ্কালটি কার- এ প্রশ্নের উত্তর প্রায় দেড় বছরেও পায়নি সিআইডি।

লম্বা চুল দেখে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও চিকিৎসক ধারণা করেছিলেন, কঙ্কালটি কোনো নারীর। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও সিআইডির ল্যাব থেকে পৃথক দুই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সিআইডি নিশ্চিত হয়েছে, এটি পুরুষের কঙ্কাল। হাড়গোড় ও খুলি পরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন, কঙ্কালটি যে ব্যক্তির, তাঁর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

এ মামলার তদন্ত ফৌজদারি অপরাধের একটি নেতিবাচক দিক সামনে নিয়ে এসেছে। সেটি হলো, দেশে কঙ্কাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো প্রযুক্তি নেই; তাই কাউকে হত্যার পর লাশ কঙ্কাল হওয়া পর্যন্ত আলামত ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারলেই অপরাধ প্রায় গোপন করা সম্ভব।
পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কঙ্কালের সঙ্গে থাকা অন্য সব আলামত দেখে অনেক সময় খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়। কিন্তু শুধু কঙ্কাল পাওয়া গেলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জড়িতদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, মাথা, খুলি, দাঁত ও হাড় মিলিয়ে কঙ্কালটির ১৫৫টি অক্ষত টুকরা আমাদের হেফাজতে রয়েছে। উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে কঙ্কালের টুকরা যুক্ত করে মানুষের পূর্ণ অবয়ব দেওয়া সম্ভব। কিন্তু দেশে এখনও এমন প্রযুক্তি নেই। এমনকি এমন বিশেষজ্ঞও নেই, যিনি কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে জানাবেন, তা কত আগের। এই কঙ্কালের রহস্য উদ্ঘাটনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯১ সালের পর থেকে শেওড়াপাড়া এলাকার সবার জিডি রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে এখনও কোনো ক্লু মেলেনি। ওই বাসার কোনো বাসিন্দা নিখোঁজ হয়েছেন- এমন কোনো দাবিদারও পাওয়া যায়নি। এখন ওই সময়ের পর থেকে সারাদেশে নিখোঁজ সবার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ওই ভবনের সবার স্বতন্ত্র প্রোফাইল তৈরি করা হচ্ছে।

সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতি এটুকুই যে কঙ্কালটির লিঙ্গীয় পরিচয় পাওয়া গেছে। তবে এটিও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কারণ, কঙ্কালের ডিএনএ পরীক্ষায় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিও পুরুষ হিসেবে শনাক্ত হয়।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, ১৯৯১ সালে শেওড়াপাড়ার ওই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটির মালিক আবদুল হালিম সরকারের পরিবারসহ বিভিন্ন ফ্ল্যাটে নানা সময় বসবাসরত ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। গত তিন দশকে ভবনটির নিচতলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিল মোট তিনটি পরিবার। আদম আলী নামের একজন ছিলেন টানা ১৯ বছর। পরে পরিবারের সদস্য বেড়ে যাওয়ায় নতুন বাসা ভাড়া নেন তিনি। আদম আলীকে খুঁজে বের করে তাঁর ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে ভবনটির ২৬ বাসিন্দার। কিন্তু কঙ্কালের সঙ্গে ডিএনএ আলামতের মিল পাওয়া যায়নি।

শেওড়াপাড়ার বাসায় কঙ্কালটি উদ্ধারের সময় নিচতলায় ভাড়াটিয়া ছিলেন শ্যামল খান। তিনি জানিয়েছেন, বাসার ভেতর লাশ পচার কোনো গন্ধ পাওয়া যায়নি। পানির সমস্যা বের করতে গিয়ে এই আস্ত কঙ্কাল বেরিয়ে আসে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, কঙ্কালের আলামত পরীক্ষা করে আমরা শুধু বলতে পারি, এটি পুরুষ নাকি নারীর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুলির কোনো আলামত থাকলে নির্ণয় করা যায়। কঙ্কাল পরীক্ষায় যেসব আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যবহূত হচ্ছে, দেশেও সেগুলো দরকার। কত দিনে একটি লাশ কঙ্কাল হয়ে যাবে তা বয়স, লিঙ্গ ও কোন অবস্থায় মরদেহ ছিল- সেসবের ওপর নির্ভর করে।