নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে জনসচেতনতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিমত, বিশ্বব্যাপী কিডনি, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ সেবন করলেই হবে না; পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। সে জন্য নগর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্রই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এটি ছাড়া এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁও সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত 'সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন' শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তাঁরা এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) প্রোগ্রাম ও সমকাল এ গোলটেবিলের যৌথ আয়োজক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিক। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যে কোনো জাতির মূল সম্পদ হলো মানবসম্পদ। মানবসম্পদ যদি স্বাস্থ্যবান না হয়, তা হলে জাতি পঙ্গু হয়ে যাবে। অসংক্রামক রোগ যদি প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে। শুধু বড় বড় হাসপাতাল দিয়ে হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিরোধই এসব রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, এনসিডিসি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সারাদেশে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় বিষয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় রোগের কারণ ও প্রতিরোধের উপায় বেশি করে প্রচার করতে হবে।
আহমেদুল কবীর বলেন, আগামী দশকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সুস্থ-সক্ষম জনগোষ্ঠী। আর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনশক্তি। নীরবেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে যাচ্ছি। উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। এটি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দেশে যত নগরায়ণ হবে, এ ধরনের রোগ তত বাড়বে।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ বলেন, কিডনি রোগ ওতপ্রোতভাবে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে জড়িত। ২০২১ সালে দেশে কিডনি রোগী ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ হয়েছে। বছরে প্রায় দুই লাখ থেকে সাত লাখ মানুষ কিডনি রোগে মারা গেছে। পৃথিবীতে প্রায় ২৫ কোটি মানুষের কিডনি রোগ আছে। যেহেতু প্রতিরোধের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, তাই কমিউনিটি ক্লিনিকের এনসিডি কর্নারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষার পাশাপাশি কিডনি রোগ শনাক্তের জন্য ইউরিন টেস্টের ব্যবস্থা রাখা দরকার।

অনুষ্ঠানে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, অসংক্রামক রোগ আর সংক্রামক রোগের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, অসংক্রামক রোগের কোনো ভ্যাকসিন নেই। তবে পাঁচটি রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে। যেগুলো চিহ্নিত করে অসংক্রমক রোগ প্রতিরোধ করা যাবে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করতে হবে। হৃদয়কে ভালোবাসতে হবে। সুযোগ পেলেই রক্তচাপ মাপতে হবে।
বিএসএমএমইউর হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোস্তফা জামান বলেন, দেশে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন করে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। কিন্তু সচেতনতা কম। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় প্রথমে ৬২ উপজেলার মাধ্যমে শুরু করে এখন ২০০ উপজেলায় এনসিডিসির আওতায় সচেতনতা ও চিকিৎসায় কাজ চলছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে প্রচার করতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, দেশে রক্তচাপ মাপার মেশিনগুলোর মধ্যে অধিকাংশ সঠিকভাবে মেজারমেন্ট করে না। এনসিডি কর্নারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রক্তচাপ মাপার মেশিন সরবরাহ করার সময় এসেছে।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, অসংক্রামক রোগের মধ্যে যেসব রোগে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রিত করে, তার মধ্যে অন্যতম উচ্চ রক্তচাপ। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে যকৃতের রোগ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ, স্নায়ুরোগের যোগ আছে। তবে জীবনযাপনে কিছু অভ্যাস গড়ে তুলে এবং বদঅভ্যাস ত্যাগ করে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। ব্যক্তি স্বাস্থ্য সুস্থ রাখতে সচেতন থাকতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান শেখ রোকন।

বিষয় : এনসিডিসি-সমকাল গোলটেবিল আলোচনা

মন্তব্য করুন