দেশে এখন অনেক ভূমি অফিস আছে যেখানে অর্ধেক জনবলই নেই। বহু অফিস আছে যেখানে তিন ভাগের এক ভাগ জনবল নেই। খোঁজ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তীব্র জনবল সংকটের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। মাঠ পর্যায়ে এই দপ্তরের প্রায় ১০ হাজার পদ শূন্য। কারণ ১৭ বছর ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, একদিকে জনবল সংকট, অন্যদিকে যে জনবল রয়েছে তারা তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ। তাদের চার ভাগের এক ভাগও তথ্যপ্রযুক্তি প্রক্রিয়ায় কাজকর্ম সম্পন্ন করতে পারছেন না।

সূত্র জানায়, মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ২০০৪ সাল থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিচারাধীন রয়েছে। কবে নিষ্পত্তি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে ছয়টি মামলা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলাগুলো করেন। নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলে তারা (নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা) পদের দিক থেকে তাদের ওপরে থাকবেন- এমন মনোভাব থেকে কেউ কেউ মামলা করেন। আবার কেউ পদোন্নতি বঞ্চিত দাবি করে সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করেছেন।

তবে এত বছর পর ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে, ওই ছয় মামলায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালত থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি অধিকতর যাচাই করতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর বেগম রুনা নাহিদ আকতার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছেন।

ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সমকালকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ে দক্ষ জনবল গঠন করতে হাজার হাজার শূন্য পদে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শূন্য পদে নিয়োগ দিতে দুটি নিয়োগ বিধিমালাও তৈরি করা হয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।

মন্ত্রী আরও বলেন, ডিজিটাইজেশনের এ যুগে নিয়োগের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিতদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু মামলার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের কাজে দারুণভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন) প্রদীপ কুমার দাস সমকালকে বলেন, নতুন বিধিমালার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা যায় কিনা- সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মতামত সংগ্রহ করেছে। ওই মতামত নিয়ে চিঠিসহ প্রস্তাবিত দুটি নিয়োগ বিধিমালা অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবরে পাঠানো হয়েছিল। বিধিমালা দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়, ওইসব মামলায় নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা বা স্থিতাবস্থা দেওয়া না হলে বিধিমালা দুটি অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সারাদেশে তিন হাজার ৪৫৭টি ভূমি অফিসে অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ ২৬ হাজার ১৪৪টি। এর মধ্যে শূন্য পদ প্রায় ১০ হাজার। চাকরির সময়সীমা শেষ হওয়ায় অনেকেরই অবসরে যাওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। যতই দিন যাচ্ছে মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায়ে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন তারা সবাই (ক্যাডার পদ বাদে) ২০০৪ সালের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত। ২০০৪ সালের পর থেকে নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চাকরির বয়সসীমা অনুযায়ী বর্তমানে কর্মরত কানুনগোরা আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। এই সময়ে সিংহভাগ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাও অবসরে যাবেন। তখন ভূমি অফিসগুলোতে জনবল সংকট আরও প্রকট হবে।

সরকার ভূমির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধার বিষয় বিবেচনা করে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের গ্রেড উন্নীত করে যথাক্রমে ১১ ও ১২ গ্রেডে নেওয়া হয়েছে। পিএসসি সর্বশেষ ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে পারে। পিএসসির মাধ্যমে ওই দুটি পদে শিক্ষিত, মেধাবী ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ তৈরি করা হয়েছে।

সারাদেশে প্রায় ১০ হাজার শূন্য পদের মধ্যে এক হাজার ৩৯২ জন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও এক হাজার ৪৪০ জন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে।
মাঠ প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন- ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি), সহকারী কমিশনার (ভূমি), অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, উপসহকারী প্রকৌশলী, কানুনগো, সার্ভেয়ার, ড্রাফটম্যান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা ও চেইনম্যান।