হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৭০ মামলার তদন্ত শিগগিরই শেষ হচ্ছে। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আট বছর আগে ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচির নামে সংগঠনটি যে ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়, সেই ঘটনায় মোট ৮৩টি মামলা হয়। এরপর ২০১৫ থেকে ২০২০ সালে বিভিন্ন ইস্যুতে কয়েক দফায় দেশের বেশ কিছু এলাকায় একই ধরনের নাশকতা চালানোর ঘটনায় আরও ২০টি মামলা হয়েছিল। সব মিলিয়ে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১০৩টি পুরোনো মামলা ছিল। এসব মামলার মধ্যে ২৯টির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়। আর ৪টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের বাকি ৭০টি মামলার তদন্ত কার্যত বন্ধ ছিল। এসব মামলা নিয়ে 'ধীরে চলো নীতি' গ্রহণ করেন সংশ্নিষ্টরা।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের বিরোধিতা করে নেওয়া কর্মসূচিতে ব্যাপক তাণ্ডবের পর হেফাজতের ব্যাপারে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়। নাশকতায় জড়িত ও ইন্ধনদাতাদের গ্রেপ্তারে শুরু হয় অভিযান। এমন প্রেক্ষাপটে হেফাজতের পুরোনো সব মামলা সচলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। একাধিক মামলায় হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরীসহ শীর্ষ নেতারা আসামি। এখন পর্যন্ত সংগঠনটির বিতর্কিত নেতা মামুনুল হকসহ ২৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন। সম্প্রতি নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ছোট-বড় এক হাজার ৪৫ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে নেওয়া কর্মসূচি ঘিরে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় ব্রা?হ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গতকাল পর্যন্ত ১৫১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা তিন হাজার ২৪৩ জন। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে ৮০ হাজারের বেশি। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে বর্তমানে হেফাজতের বিরুদ্ধে ২২১টি মামলা তদন্তাধীন। এর মধ্যে পুরোনো মামলার তদন্ত আগে শেষ করা হবে। নতুন মামলার তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান একসঙ্গে চলবে। গ্রেপ্তারের তালিকায় আছেন আরও দেড় শতাধিক হেফাজত নেতা। যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নাশকতার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। বর্তমানে হেফাজত ঘিরে যে নীতি নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে আপাতত উল্টো পথে চলার শঙ্কা খুব বেশি নেই। অতীতের মতো 'ম্যানেজ নীতি' নয়, কৌশলে 'গরমে-নরমে' চলবে হেফাজত নিয়ন্ত্রণ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, হেফাজতের মামলার তদন্তে বেশ অগ্রগতি আছে। অনেক নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। মাসখানেকের মধ্যে হেফাজতের বেশ কিছু মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি হবে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ২০১৩ সালে হেফাজত ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়। এরপর অনেকের ধারণা ছিল হয়তো তারা ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথে চলবে। সরকারও পরবর্তী সময়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল। আট বছর পর এসে দেখা গেল, তারা তো সঠিক পথে ফেরেইনি, উল্টো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। গোপনে তারা নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই হেফাজতকে অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই। এ কারণে হেফাজতের পুরোনো মামলা সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুনভাবে তারা যে ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে তার জন্য মামলা হয়েছে।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লে. কর্নেল মুহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বেশ কিছু এলাকায় হেফাজত ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়। এর আগেও ২০১৩ সালে তাদের ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে। তাণ্ডব ও নাশকতায় জড়ালে কাউকে ছাড় নয়। জানমালের ক্ষতি সাধন করা হলে দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। চলমান অভিযানও অব্যাহত থাকবে।
হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দিন রুহি বলেন, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে হেফাজতকে ইসলাম ও কওমি মাদ্রাসার কল্যাণে কাজ করতে হবে। তবে বাবুনগরীর নেতৃত্বে সংগঠনটি ভুল পথে ছিল। কমিটি বিলুপ্তির পর সংগঠনটি এখন নেতৃত্বশূন্য। অচিরেই হেফাজতকে আবার মাওলানা আহমদ শফীর আদর্শে পরিচালিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ২০১০ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাহ আহমদ শফী। ২০১১ সালে সংগঠনটি বাংলাদেশ নারী উন্নয়ন নীতির কয়েকটি ধারাকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে এর তীব্র বিরোধিতা করে। এরপর বাংলা নববর্ষ এবং পহেলা বৈশাখকে বিদেশি সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করে বিরোধিতা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন হেফাজত নেতারা। সংগঠনটির বিরোধিতার মুখে ঢাকায় সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে গ্রিক দেবীর আদলে নির্মিত একটি ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
২০১৩ সালে ফের আলোচনায় আসে সংগঠনটি। রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবি জানায় তারা। ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ছয়টি প্রবেশমুখে অবরোধ কর্মসূচি শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক। একপর্যায়ে হেফাজতের উগ্র নেতাকর্মীরা সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুর ও নাশকতা চালায়। এসব ঘটনায় ঢাকাসহ ৭টি জেলায় মোট ৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলাগুলোতে তিন হাজার ৪১৬ জনের নামে এবং ৮৪ হাজার ৭৯৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিল। আসামিদের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, যুবদল, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাকর্মীদের নাম আছে। হেফাজতের ২৯ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হলেও বিচার কার্যক্রমে তেমন কোনো গতি নেই। বাগেরহাটের একটি মামলার রায়ে সব আসামি খালাস পেয়েছেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে'র ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়েও গুজব ছড়ায় হেফাজত।
হেফাজতের পুরোনো ৭০ মামলার মধ্যে ৫৬টির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এর মধ্যে ১৫টি মামলার তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ। পুরোনো একটি মামলায় এরই মধ্যে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আরও দুই মামলায় তিনি বর্তমানে হেফাজতে আছেন।
গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম সমকালকে বলেন, হেফাজতের পুরোনো মামলায় দু'জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সর্বশেষ জবানবন্দি দেন হেফাজতের সাবেক প্রচার সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম। হেফাজতকে অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল। এর আগে বাবুনগরীও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
ভাঙচুরের নির্দেশদাতা মামুনুল :নারায়ণঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় নাশকতার ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আবু বক্কর সিদ্দিক নামে একজনকে মঙ্গলবার মিজমিজি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ওই এলাকার বায়তুল নাজাত জামে মসজিদের ইমাম। এরপর আদালতে হাজির করা হলে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি। আবু বকর জানান, তার সামনে মসজিদ কমিটির সভাপতিকে ফোন করে হেফাজত নেতা মামুনুল হক নির্দেশ দেন, ভাঙচুর-নাশকতা চালিয়ে কর্মসূচি সফল করতে হবে। ২৭ মার্চ হেফাজতের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখা সভাপতি মাহমুদুল হাসান পাটোয়ারী কর্মসূচি সফল করার উদ্দেশ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান করেন।
এ ব্যাপারে পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, হেফাজতের ২৩টি মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। এর মধ্যে চারজন জবানবন্দি দিয়েছেন। লুটের বেশ কিছু মালপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাণ্ডবে মামুনুল কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল তা তদন্তে উঠে এসেছে। পিবিআইর মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন করা হবে।
কোন পথে হেফাজত :হেফাজতের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে খোঁজ রাখেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, ২৫ এপ্রিল বাবুনগরী হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির পর সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের ওপর তীক্ষষ্ট নজর রাখা হচ্ছে। হেফাজত নেতা মামুনুল, হারুন ইজাহারসহ যারা কট্টর তাদের আয়-ব্যয়ের উৎস খতিয়ে দেখছে একাধিক সংস্থা। কোন কোন রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রেখে তারা হেফাজত ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছিলেন, তাও জানার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া আগামীতে অপেক্ষাকৃত উদার ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেই এমন আলেম-ওলামাদের দিয়ে কমিটি করার কথা ভাবছেন নীতি নির্ধারকরা। তবে ২০২০ সালে আহমদ শফীর মৃত্যুর পর আমির হন জুনায়েদ বাবুনগরী। সেই কমিটিতে শফিপন্থি কাউকে রাখা হয়নি। এবার বাবুনগরী ও শফিপন্থিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হতে পারে।
কাসেমী গ্রেপ্তার :ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সদ্য পদত্যাগকারী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুর রহিম কাসেমীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে তাকে পৌর এলাকার ভাদুঘর থেকে আটক করা হয়।
ব্র্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. রইছ উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি তাণ্ডবের সঙ্গে কাসেমীর সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারির ধ্বংসাত্মক কাজে তিনি জড়িত।
গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব চালিয়ে রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ভাঙচুর চালায় হেফাজত। এসব ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ৫৬টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৪১৪ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪১৫ জন।

মন্তব্য করুন