খুলনার তেরখাদা উপজেলার পরোখালী গ্রামের মাঠে পাশাপাশি তিনটি খাটিয়া। দুটিতে মিমের বাবা-মা ও একটিতে ছোট দুই বোন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় যখন তাদের জানাজা হচ্ছিল তখন আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ওদিকে বাড়িতে ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে চলেছে ছোট্ট মিম, তার শোকে যেন কাঁদছে আকাশও।
সোমবার সকালে পদ্মা নদীতে বালুবাহী বাল্ক্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন মিম আক্তারের বাবা মনির শিকদার, মা হেনা বেগম, ছোট দুই বোন সুমি আক্তার ও রুমি আক্তার। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় মিম। দুর্ঘটনার পর সে একটি ব্যাগ ধরে নদীতে ভাসছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করে তাকে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর হাসপাতালে ভর্তি করেন। দাদির মৃত্যুর খবর পেয়ে মিম পরিবারের সঙ্গে ঢাকা থেকে খুলনার তেরখাদার পরোখালী গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিল। গতকাল সেই দাদি লাইলী বেগমের কবরের পাশেই একে একে মিমের বাবা-মা ও দুই বোনকে সমাহিত করা হয়।
সোমবার বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহ পরোখালী গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ওই বাড়িতে ভিড় করেন। মিমকে নিয়েই উৎকণ্ঠা ছিল বেশি। রাত থেকে মিম তার নানির কাছেই রয়েছে। তার নানাবাড়ি তেরখাদা উপজেলা সদরের পানতিতা গ্রামে। মা-বাবা, দুই বোনকে হারিয়ে কান্না থামছেই না মিমের।
গতকাল সকালে তেরখাদা উপজেলার সদর ইউনিয়ানের পারোখালী গ্রামে মিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবা-মা ও ছোট দুই বোন হারিয়ে বাকরুদ্ধ মিম। শুধু ফ্যালফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে চলেছে। অবুঝ শিশুটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও নেই স্বজন-প্রতিবেশীদের। এই শিশু এখন কীভাবে, কোথায় থাকবে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে- এসব নিয়েই চিন্তিত সবাই। শিশু মিমের কান্নায় চোখ ভিজে উঠছে তাদেরও।
সকালে জানাজায় সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। এ সময় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবার চোখেই ছিল পানি। আকাশেও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। যেন প্রকৃতিও কাঁদছে। জানাজায় অংশ নেন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল, তেরখাদা উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম, খুলনা মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান পলাশ প্রমুখ।
মনির শিকদারের ছোট ভাই মো. কামরুজ্জামান জানান, চার ভাইবোনের মধ্যে মনির ছিল তৃতীয়। ঢাকার মিরপুর-১১ মসজিদ মার্কেটে কাটা কাপড়ের দোকান ছিল তার। তিনি থাকতেনও ওই এলাকায়। তিনি বলেন, 'ভাই মাকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়ি আসছিল। কিন্তু মাকে আর দেখা হলো না, নিজেই পরিবারকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে চলে গেল। মায়ের কবর দেওয়া হয়েছে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায়। আর মঙ্গলবার কবর দিলাম ভাই-ভাবি, ভাইঝিদের।'
উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে মিমের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মিম স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণ ও পড়াশোনার ব্যবস্থাও আমরা করব। আপাতত মিম তার নানির কাছেই থাকবে।

মন্তব্য করুন